গোপাল ভাঁড়ের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র কি বাস্তবেও এমন বোকা ছিলেন?
গোপাল ভাঁড়ের গল্পে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে প্রায়ই এমন এক সরল, হাস্যকর এবং বুদ্ধিতে দুর্বল রাজা হিসেবে দেখা যায়, যাকে তার মন্ত্রী নানা কৌশলে বোকা বানিয়ে দেন। কিন্তু এই চরিত্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের মিল কতটা? বাস্তবের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র কি সত্যিই এতটাই বোকা ছিলেন?
ইতিহাসের নথি ও আধুনিক গবেষণা বলছে, মোটেই নয়। বরং অষ্টাদশ শতকের বাংলার অন্যতম প্রভাবশালী জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র রায় ছিলেন যথেষ্ট বিচক্ষণ, রাজনৈতিকভাবে কৌশলী এবং পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারা একজন শাসক। তবে তার চরিত্রও একেবারে নির্ভুল বা আদর্শ রাজা ছিল না। ধর্ম, জাতিভেদ, জমিদারি রাজনীতি এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে তার সম্পর্ক সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জটিল এক ঐতিহাসিক চরিত্র।
কে ছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র?
কৃষ্ণচন্দ্র রায় জন্মেছিলেন ১৭১০ সালে। তিনি নদিয়ার রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী এবং রঘুরাম রায়ের পুত্র। ১৭২৮ সাল থেকে নদিয়ার জমিদার হিসেবে তার উত্থান ঘটে। তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। অর্থাৎ কার্টুন বা লোককথার হাস্যরসাত্মক চরিত্রের বিপরীতে বাস্তব কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন শিক্ষিত ও রাজনৈতিক বোধসম্পন্ন এক জমিদার।
তবে তাকে আধুনিক অর্থে ‘স্বাধীন রাজা’ ভাবলে ভুল হবে। অষ্টাদশ শতকের নদিয়ার রাজার অবস্থান ছিল মূলত জমিদার বা আঞ্চলিক ক্ষমতাধর ভূস্বামীর। তাকে বাংলার নবাব এবং বৃহত্তর মোগল রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই চলতে হতো। গবেষক জোশুয়া এর্লিখও কৃষ্ণচন্দ্রকে ‘লিটল কিং’ বা স্থানীয় ক্ষমতাধর শাসক হিসেবে দেখিয়েছেন, যার রাজকীয় মর্যাদা ও বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে একটা পার্থক্য ছিল।
গোপাল ভাঁড় কি সত্যিই তার সভার ভাঁড় ছিলেন?
এখানেই সবচেয়ে বড় চমক। গোপাল ভাঁড়ের অস্তিত্বই ইতিহাসে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, গোপাল ভাঁড় মূলত বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি কিংবদন্তি চরিত্র। উনিশ শতকের গোড়ার দিকের বটতলার সাহিত্যে তার উপস্থিতি পাওয়া যায়। তাকে কৃষ্ণচন্দ্রের সভার ভাঁড় হিসেবে জনপ্রিয়ভাবে মনে করা হলেও কৃষ্ণচন্দ্রের সমসাময়িক নথিতে তার উল্লেখ পাওয়া যায় না। ফলে ঐতিহাসিক গোপাল ভাঁড় এবং লোককথার গোপাল ভাঁড়কে এক করে দেখা ঠিক নয়।
এমনকি গবেষণায় কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে ‘শঙ্কর তরঙ্গ’ নামে এক ব্যক্তির সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়, যিনি তার দেহরক্ষী ছিলেন এবং সাহস, বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার জন্য রাজার কাছে প্রিয় ছিলেন। সময়ের সঙ্গে তার মতো বাস্তব চরিত্রের গুণাবলি হয়তো লোককথার গোপালের চরিত্রে এসে মিশে থাকতে পারে যদিও এটিও নিশ্চিত ইতিহাস নয়। সুতরাং কার্টুনে গোপাল ভাঁড় বা মন্ত্রী রাজাকে বারবার বোকা বানান বলে কৃষ্ণচন্দ্র বাস্তবেও বোকা ছিলেন এমন সিদ্ধান্তের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।
সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে কৃষ্ণচন্দ্র ষড়যন্ত্র করেছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে কৃষ্ণচন্দ্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়টি রয়েছে।১৭৫৬ সালে সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হওয়ার পর তার সঙ্গে বাংলার প্রভাবশালী অভিজাতদের একটি অংশের বিরোধ তৈরি হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন মীর জাফর, জগৎশেঠদের মতো শক্তিশালী ব্যক্তিরা। ঐতিহাসিক সূত্রে কৃষ্ণচন্দ্রও সিরাজের বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাপিডিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনীতে আরও সরাসরি বলা হয়েছে, কৃষ্ণচন্দ্র ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলেন এবং রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ সিরাজউদ্দৌলার পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। পলাশীর ষড়যন্ত্রকে শুধু ‘কৃষ্ণচন্দ্রের ষড়যন্ত্র’ বলা ইতিহাসকেই পরিবর্তন করে ফেলা হবে। আধুনিক গবেষণায় দেখা যায়, সিরাজের বিরুদ্ধে একাধিক গোষ্ঠীর স্বার্থ জড়িয়ে ছিল। মীর জাফর, জগৎশেঠ, ঘসেটি বেগম, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিভিন্ন মাত্রায় ঘটনাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে কিছু ইতিহাসবিদের মতে, ব্রিটিশরাই সিরাজকে সরানোর উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে এসেছিল এবং স্থানীয় অসন্তোষকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছিল। অর্থাৎ কৃষ্ণচন্দ্র সিরাজের পক্ষের মানুষ ছিলেন না এ কথা বলা যায়। কিন্তু ‘তিনিই পলাশীর প্রধান ষড়যন্ত্রকারী’ এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই।
ব্রিটিশদের সঙ্গে কৃষ্ণচন্দ্রের সম্পর্ক কেমন ছিল?
কৃষ্ণচন্দ্রের ব্রিটিশ-সম্পর্ক ছিল নিছক বন্ধুত্বের নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থের সম্পর্ক। তিনি বুঝেছিলেন যে বাংলার পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল হচ্ছে এবং ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। গবেষণাতেও তার রাজনৈতিক কৌশল ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে।
পলাশীর যুদ্ধের পর এই সম্পর্ক তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরে মীর কাশিমের সঙ্গে বিরোধের সময় কৃষ্ণচন্দ্র বন্দি হন এবং মৃত্যুদণ্ডের মুখে পড়েন। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশরা তার মুক্তির ব্যবস্থা করে। এরপর ব্রিটিশদের আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে তিনি ‘মহারাজা’ উপাধি পান এবং রবার্ট ক্লাইভ তাকে পাঁচটি কামানও দেন। অর্থাৎ ব্রিটিশদের সঙ্গে তার সম্পর্ক যে ঘনিষ্ঠ ও স্বার্থনির্ভর ছিল, তা নিয়ে সন্দেহের খুব বেশি অবকাশ নেই।
প্রজাদের কাছে কৃষ্ণচন্দ্র কেমন রাজা ছিলেন?
এখানে কৃষ্ণচন্দ্রকে এককথায় ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ বলা কঠিন। কারণ তার শাসনের যে তথ্য পাওয়া যায়, তার বড় অংশই জমিদারি, ধর্ম ও অভিজাত সমাজকে কেন্দ্র করে। ইতিহাসবিদ রতন দাশগুপ্তের গবেষণা অনুযায়ী, কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন ব্রাহ্মণদের উদার পৃষ্ঠপোষক, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের এলাকায় জাতিভেদ কঠোরভাবে প্রয়োগ করতেন।
তিনি মন্দির নির্মাণ এবং ব্যয়বহুল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিলেন। এই বিপুল ব্যয়ের সঙ্গে তার জমিদারির আর্থিক সংকটও চলছিল। গবেষকের ব্যাখ্যায়, এসব কাজ কেবল ধর্মীয় আবেগের বিষয় ছিল না; সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী জমিদারদের মধ্যে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার সঙ্গেও তা যুক্ত ছিল।
তাই তাকে আধুনিক অর্থে ‘জনদরদি রাজা’ বলা যেমন ঠিক হবে না, তেমনই অত্যাচারী শাসক হিসেবে চিহ্নিত করার মতোও যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। প্রজাদের দৈনন্দিন জীবন, রাজস্ব আদায় বা তাদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত আচরণ সম্পর্কে যে পরিমাণ নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়, তা দিয়ে এমন চূড়ান্ত রায় দেওয়া সম্ভব নয়।
তার সবচেয়ে বড় অবদান
কৃষ্ণচন্দ্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব শুধু রাজনীতি বা ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে নয়। তিনি ছিলেন শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বড় পৃষ্ঠপোষক। তার সভায় কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর, রামপ্রসাদ সেন, বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার, কৃষ্ণানন্দ বাচস্পতি ও জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের মতো বিদ্বানদের উপস্থিতি ছিল। ভারতচন্দ্র তার পৃষ্ঠপোষকতায় ‘অন্নদামঙ্গল’ রচনা করেন। নবদ্বীপসহ নদিয়ার বিভিন্ন জায়গায় সংস্কৃত শিক্ষার প্রসারে তিনি অর্থ ব্যয় করেন, সংস্কৃত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য জমি ও আর্থিক সহায়তাও দেন।
ইতিহাসের কৃষ্ণচন্দ্র আসলে কেমন ছিলেন?
সব তথ্য একসঙ্গে রাখলে দেখা যায়, গোপাল ভাঁড়ের গল্পের সরল-বোকা রাজা আর ইতিহাসের কৃষ্ণচন্দ্র এক মানুষ নন। বাস্তব কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন শিক্ষিত, রাজনৈতিকভাবে দূরদর্শী এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বুঝতে সক্ষম এক জমিদার। কিন্তু তার সেই বিচক্ষণতা সবসময় নৈতিকতার সমার্থক ছিল না।
সিরাজউদ্দৌলার বিরোধিতা এবং পলাশীর সময় ব্রিটিশপন্থী অবস্থান তাকে ইতিহাসে বিতর্কিত করে রেখেছে। আবার সাহিত্য, সংস্কৃত শিক্ষা ও ধর্মীয় সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা তার অন্য একটি পরিচয় তৈরি করেছে। ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্কও ছিল স্পষ্ট রাজনৈতিক হিসাবের অংশ।
আর গোপাল ভাঁড়? তার গল্প বাংলার সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হলেও সেই গল্পের রাজাকে ইতিহাসের দলিল ধরে বিচার করা ঠিক নয়। বরং ইতিহাসের কৃষ্ণচন্দ্রকে বুঝতে হলে লোককথার হাস্যরস সরিয়ে অষ্টাদশ শতকের বাংলার জমিদারি রাজনীতি, নবাবি দরবার এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থানের জটিল বাস্তবতার দিকে তাকাতে হয়। সেখানেই দেখা যায় তিনি বোকা রাজা নন; বরং নিজের সময়ের রাজনৈতিক খেলায় অত্যন্ত হিসাবি, কিন্তু একই সঙ্গে গভীরভাবে বিতর্কিত এক চরিত্র।
কেএসকে






