ইয়েমেনে তাইজের দিকে এগোচ্ছে সরকারি বাহিনী, বাড়ছে মানবিক সংকট
ইয়েমেনের তাইজে আবারও তীব্র হয়েছে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের লড়াই। হুথিদের হামলা ঠেকিয়ে পশ্চিম তাইজে কয়েকটি অবস্থান দখলে নিয়েছে সৌদি আরব–সমর্থিত সরকারি বাহিনী। এর মধ্যেই সৌদি আরবে হামলা চালানোর দাবি করেছে হুথিরা। তবে, ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের দখল বাড়ার খবরও এসেছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) তাইজ থেকে আল-জাজিরা আরবির সাংবাদিক ইয়াসের হাসান বলেন, গত রোববার পশ্চিম তাইজে হুথিদের হামলা ঠেকিয়ে সামনে এগিয়েছে সরকারি বাহিনী। তাদের এ লড়াইয়ে সৌদি আরবের সমর্থন রয়েছে। একই সঙ্গে, হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলাও চালানো হচ্ছে। পশ্চিম উপকূলের মোখা, ধুবাব ও আশপাশের এলাকায় এসব হামলা চলছে বলে সরকারি বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে, সোমবার এক বিবৃতিতে হুথিরা জানায়, সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে তারা। তাদের দাবি, খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটির সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, রাডার স্থাপনা, রানওয়ে ও গোলাবারুদের গুদাম। তবে, হুথিদের এ দাবির বিষয়ে সৌদি আরব তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
হুথিরা বলেছেন, ইয়েমেনে সৌদি আরবের পাঁচ দিনের বিমান হামলার জবাবেই তারা এসব হামলা চালিয়েছেন। তাদের দাবি, ওই পাঁচ দিনে ইয়েমেনজুড়ে ৩০০টির বেশি বিমান হামলা হয়েছে। তবে, এসব হামলার বিষয়ে স্বাধীনভাবে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা যায়নি।
এর আগে, গত রোববার সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা আবহা শহর ও খামিস মুশাইত এলাকায় সতর্কতা জারি করেছিল। কিছুক্ষণ পর অবশ্য সেই সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়। তবে হুথিরা দক্ষিণ সৌদি আরবেও বিমান হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে তেল স্থাপনাও ছিল। এতে অনেকের হতাহতের খবরও পাওয়া গেছে।

সৌদি আরবের দুই এলাকায় জরুরি সতর্কতা
ইয়েমেনে এক দশকের বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। গত জুলাইয়ে আবারও বড় ধরনের লড়াই শুরু হয়। এতে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বড় ধরনের সংঘাত বন্ধের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা আবার হুমকির মুখে পড়ে। পাশাপাশি লড়াই ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে সৌদি আরবেও ছড়িয়ে পড়ে।
তবে, গত সপ্তাহে লোহিত সাগরের উপকূলে হুথিদের দখল বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। তাইজসহ বিভিন্ন এলাকায় লড়াই তীব্র হওয়ার মধ্যে উপকূলের কিছু এলাকা দখলে নেয় তারা। ফলে, বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ দিয়ে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ চলাচল করে। সামুদ্রিক তেলের প্রায় ১১ শতাংশ এবং এলএনজির প্রায় ৮ শতাংশও এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়।
একই সময়ে লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলের আরও কয়েকটি কৌশলগত দ্বীপে হুথিদের উপস্থিতি বাড়ার খবর এসেছে। সোমবার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও হুথিদের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ দ্বীপে হুথি যোদ্ধাদের মোতায়েনের কথা জানা গেছে। দ্বীপ দুটি বাব আল-মান্দেব থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার উত্তরে।
এদিকে, নতুন এ সংঘাতের কারণে ইয়েমেনে মানবিক সংকটও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে প্রায় ৮৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ ইয়েমেন ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ জিবুতিতে পৌঁছেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ৬ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় লড়াইয়ে ২ হাজার ৮৮৩ জন হতাহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫০৪ জন নিহত এবং ২ হাজার ৩৭৯ জন আহত হয়েছেন। গত শুক্রবার পর্যন্ত তাইজ, মারিব, আল-জাওফ, লাহজ, হোদেইদাহ, আবিয়ান ও শাবওয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ৭৭ হাজার ৭৮৯ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ডব্লিউএইচওর হিসাবে, সবচেয়ে বেশি হতাহত হয়েছে মারিবে। গত ৯ সেপ্টেম্বর সেখানে ৪৬৯ জন নিহত বা আহত হয়েছেন। পরদিন আরও ১৭৭ জন এবং গত শুক্রবার ২১৯ জন হতাহত হন। ইয়েমেনের মোট হতাহতের ৪৯ শতাংশই মারিবে। অন্যদিকে, তাইজ ও পশ্চিম উপকূলের এলাকাগুলোতে হয়েছে ৪৩ শতাংশ হতাহত।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমডিআরএইচ/



