বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ, লোডশেডিং কি কমবে?
সারাদেশে লোডশেডিং চলছে। তা রীতিমতো অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। যাদের পরীক্ষা প্রস্তুতি ও পড়াশোনা প্রচণ্ডভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে যাচ্ছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পড়ছেন লোকসানে। প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষ, যাদের রুজি-রোজগার সরাসরি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল, তারা পড়েছেন গভীর আর্থিক সংকটে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে স্বল্পমেয়াদি সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে শহরের বর্জ্য বা ময়লা থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি (ওয়েস্ট-টু-এনার্জি) একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। প্রতিদিন দেশের বড় শহরগুলোতে হাজার হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। যার সিংহভাগই যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হয় বা পোড়ানো হয়, যা পরিবেশ দূষণেরও কারণ। এই বর্জ্যকে যদি বায়োগ্যাস বা তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়, তাহলে একদিকে জ্বালানি সংকট কিছুটা লাঘব হবে, অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যারও সমাধান হবে।
আশার কথা, ঢাকাসহ কয়েকটি বড় শহরে এরই মধ্যে এ ধরনের প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তার পরিসর এখনো সীমিত বলে মনে হয়। সরকার যদি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে দেশের প্রতিটি বড় শহর ও পৌরসভায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প সম্প্রসারণ করে, পাশাপাশি রুফটপ সোলারের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও বাড়ায়, তাহলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। এদিকে দেশে প্রথমবারের মতো বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
রাজধানীর আমিনবাজারে চীনা বিনিয়োগে বর্জ্য থেকে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের আগস্টে এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। তবে প্রকল্পের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সরকার কিনবে ২৫ টাকায়। চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের প্রকল্পে সরকার তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ কিনছে।
দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নতুন নয়। এক দশকের বেশি সময় ধরে নেওয়া এ ধরনের প্রকল্পের কোনোটিই উৎপাদনে যেতে পারেনি। এমন বাস্তবতায় গত জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইলের প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় সাধারণত ১২-১৪ টাকা এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুতের গড় ব্যয় ২২-২৪ টাকার মতো।
আন্তর্জাতিকভাবে বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম প্রকল্পভেদে ভিন্ন হলেও ভারতের সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রকল্পে তা ইউনিটপ্রতি ৬-৮ রুপির মধ্যে; বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮-১১ টাকা। চীনে প্রতি ইউনিট বর্জ্য বিদ্যুৎ সরকার কেনে (বেঞ্চমার্ক ট্যারিফ) শূন্য দশমিক ৬৫ ইউয়ানে, যা ১১-১২ টাকা।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘ট্যারিফ দিয়ে বর্জ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা বাদ পড়ে যায়। এখানে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মূল বিষয়। বিদ্যুৎ বাইপ্রডাক্ট। তাই দামটা বেশি মনে হলেও পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তুলনা করলে তা সহনীয়। আমিনবাজার প্রকল্পে চীনের সিএমইসি গ্রুপ বিনিয়োগ করবে। প্রতিদিন তিন হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। ২৫ বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকাঠামো রেখে ২০২৮ সালের আগস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’
দেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বহুবছর ধরে শোনা যাচ্ছে। এর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। আমিন বাজারে বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ থেকে বোঝা যাচ্ছে, এর বাস্তবায়ন শুরু হতে যাচ্ছে। এটি একটি সুসংবাদ। এখন বর্জ্য পরিবেশ দূষণের কারণ হবে না। এটি যে কাজে লাগানো যায় এবং পরিবেশকে বিশুদ্ধ রাখা যায়, তার নজির হচ্ছে এ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
বিশ্বের বহু দেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর বেশিরভাগই বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এক্ষেত্রে চীন এক নম্বর অবস্থানে রয়েছে। চীন বর্জ্য থেকে প্রতিবছর ১ লাখ ১৮ হাজার ৬৪৫ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর ৭১ হাজার ৭১৪, জার্মানি ৫৭ হাজার ২০০, যুক্তরাজ্য ৪১ হাজার ৭৯৪ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এছাড়া ব্রাজিল, জাপান, ইটালি, থাইল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, সুইডেনসহ আরও অনেক দেশ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
পার্শ্ববর্তী ভারত উৎপাদন করে ৪৫ হাজার ৭৯৫ গিগাওয়াট। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশও বহু আগে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উপাদন করছে। আমরাই শুধু পিছিয়ে আছি। অথচ আমাদের বর্জ্যের অভাব নেই। এসব বর্জ্য স্তুপ আকারে ফেলে রাখা হচ্ছে। এতে পরিবেশ যেমন দূষিত হচ্ছে, তেমনি নদী-নালা, জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন ঢাকায় ৩ থেকে ৪ হজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
ঢাকার আমিন বাজার বর্জ্য ফেলার প্রধান একটি স্থান। সেখানে গেলে দেখা যায়, বর্জ্য ফেলতে ফেলতে বিশাল পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে। বর্জ্যের দুর্গন্ধে সেখানের আশপাশের পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি যাতায়াত করতেও সমস্যা হচ্ছে। রাজধানীর সব বর্জ্য যে সেখানে ফেলা হয়, তা নয়। অন্যান্য স্থানেও ফেলা হয়। অনেক সময় রাজধানীর বর্জ্য সঠিকভাবে পরিস্কার করা হয় না। এক্ষেত্রে দুই সিটি করপোরেশনেরই দায় রয়েছে। নাগরিক অসচেতনতাও রয়েছে। যেখানে সেখানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। ফলে রাজধানীর অনেক এলাকা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে। এমনকি ব্যস্ততম সড়কের পাশে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ফেলার স্থান করা হয়েছে।
সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব বছরের পর বছর ধরে চলছে। এই বর্জ্য কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা অনেক কথা বলেছেন। তাদের কথামতো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্জ্য থেকে শুধু যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তা নয়, পরিবেশবান্ধব বায়োগ্যাসও উৎপাদন করা যায়। বিশেষ করে খাদ্য ও পশুবর্জ্য থেকে এই গ্যাস উৎপাদন করা যায়।
বিশ্বের বহুদেশে এ গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ। দেশে দিন দিন বিদ্যুৎ সংকট প্রকট হয়ে উঠছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশিরভাগ জ্বালানি নির্ভর হওয়ায় উৎপাদন খরচও বেশি হচ্ছে। বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে ডলার সংকটে ভুগতে হচ্ছে। এ সংকট সহসা কাটবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ফলে সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করতে হবে।
এক্ষেত্রে বর্জ্য একটি উপকরণ হয়ে আছে। বিনাপয়সায় এ বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এগুলো যথাযথ প্রক্রিয়া ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগালে তাতে বিদ্যুৎ সংকট কিছুটা হলেও লাঘব হবে। দেরিতে হলেও সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে সরকার যে ঘোষণা দিয়েছে, তা যাতে ঘোষণা কিংবা বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। কথার কথায় পরিণত না হয়, এ ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে লোডশেডিংয়ের এই দুর্ভোগ থেকে জনগণ কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় শুধু আমদানি বা জ্বালানি তেলনির্ভরতা না বাড়িয়ে টেকসই ও দেশীয় উৎসে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
কেএসকে


