ঢাবি ক্যাম্পাসে স্বস্তি ফেরালো সড়কবাতি, এখন দাবি কার্যকর সিসি ক্যামেরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে একসময় সন্ধ্যা নামলেই অনেক জায়গা গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে যেতো। কোথাও সড়কবাতি ছিল না, আবার কোথাও বাতি থাকলেও তা ছিল অচল। অন্ধকার সেসব জায়গা দিয়ে চলতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের থাকতে হতো অস্বস্তির মধ্যে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল।
তবে এখন বদলেছে রাতের চিত্র। বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সন্ধ্যা থেকে জ্বলছে সড়কবাতি। ফলে রাতের বেলা ক্যাম্পাসের অনেকটা অংশ এখন আগের তুলনায় আলোকিত থাকছে। এতে স্বস্তি ফিরেছে শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের মধ্যে।
তবে ছাত্রছাত্রীরা বলছেন, শুধু আলো বাড়লেই রাতের ক্যাম্পাস নিরাপদ হবে না। পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নিয়মিত টহল, বহিরাগত ও ভবঘুরে নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো। কারণ, এখানে প্রায়ই নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি, ছিনতাই ও মাদক সেবনের ঘটনা ঘটছে। এমনকি চালকদের অচেতন করে রিকশা ছিনতাইও হয়েছে। সেই সঙ্গে আছে বহিরাগতদের অবাধ চলাচল এবং ভবঘুরে ব্যক্তিদের অবস্থান। তাই, সড়কবাতি জ্বলার পর এখন শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও যেন জোরদার করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাতের বেলা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে/ছবি: জাগো নিউজ
আলোর কারণে অপরাধ অনেকাংশে কমবে
বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সালমান মনে করেন, ক্যাম্পাসজুড়ে আলোর ব্যবস্থা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে আলোর কারণে চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ অনেকাংশে কমবে। এটা অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তন। এর পাশাপাশি সিসিটিভি কার্যকর করা, ভবঘুরে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত টহল নিশ্চিত করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও নিরাপদ করা সম্ভব হবে।
সালমান জানান, আগে ক্যাম্পাসের কিছু জায়গায় পর্যাপ্ত আলো না থাকায় রাতে চলাচলের সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় কাজ করতো। এখন আলোর পরিমাণ বাড়ায় রাতেও তুলনামূলক স্বস্তিতে চলাচল করা যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় / নিরাপদে সড়ক পারাপারের পদচারী সেতুই যখন আতঙ্কের কারণ

ডাকসুর এক বছর: সাফল্যের দাবি, ব্যর্থতার অভিযোগ
নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাবোধ বাড়াবে
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী অহনা আহসানের মতে, রাতের সড়কবাতি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে স্বস্তিদায়ক।
তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে আলোর ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ বাড়াতে এটি প্রয়োজন ছিল, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য। অনেক সময় কোনো কারণে একজন নারী শিক্ষার্থীর হলে ফিরতে রাত হয়ে যায়। তখন অন্তত আলোকিত রাস্তা তাকে কিছুটা নিরাপত্তাবোধ দেবে।
তবে এর পাশাপাশি প্রক্টরিয়াল টিমের তৎপরতা বাড়ানোর দাবি তুলেছেন অহনা। তিনি বলেন, শুধু আলোর ব্যবস্থা করেই সব সমস্যা বন্ধ করা যাবে না। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রশাসনকে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। সিসিটিভির সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করতে হবে। প্রয়োজনে টহল ও নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যাও বাড়াতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাতের বেলা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে/ছবি: জাগো নিউজ
সহজ হবে অপরাধী শনাক্ত
সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নোভা জানান, রাতে পর্যাপ্ত আলো শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাবোধ বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধী শনাক্ত করতেও সহায়ক হতে পারে।
তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। অন্ধকার জায়গাগুলো আলোকিত থাকলে চোর, ছিনতাইকারী বা মাদকসেবীরা আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে অপরাধ করতে পারবে না। কোনো অপরাধ ঘটলেও অপরাধীকে শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হবে।
তবে এর সঙ্গে সিসিটিভির সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে অপরাধীর চেহারা বা গতিবিধি স্পষ্টভাবে বোঝা গেলে শনাক্তকরণও সহজ হবে। একই সঙ্গে নারী-পুরুষ উভয় শিক্ষার্থীই সন্ধ্যার পর তুলনামূলক নিরাপদে চলাচল করতে পারবেন।
ক্যাম্পাসে আলোর ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ বাড়াতে এটি প্রয়োজন ছিল, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য। অনেক সময় কোনো কারণে একজন নারী শিক্ষার্থীর হলে ফিরতে রাত হয়ে যায়। তখন অন্তত আলোকিত রাস্তা তাকে কিছুটা নিরাপত্তাবোধ দেবে।- শিক্ষার্থী অহনা আহসান
স্বস্তিতে সাধারণ পথচারীও
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক দিয়ে চলাচলকারী সাধারণ পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাতে আলো বাড়ায় তারা স্বস্তি পাচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ভবঘুরে ও নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের অবস্থান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে তাদের।
এক পথচারী বলেন, রাস্তার ধারে এত আলো থাকা ভালো দিক। অন্ধকার বা আড়াল পাওয়ার জায়গাগুলোতে অনেক সময় কয়েকজনকে একসঙ্গে বসে থাকতে ও নেশাদ্রব্য সেবন করতে দেখা যায়। এসব জায়গা আলোকিত হলে অন্তত তাদের আড়ালে থাকার সুযোগ কমবে।
তবে তিনি জানান, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ভবঘুরে ব্যক্তিদের অবস্থানের কারণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। কোথাও কোথাও রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা ও মলমূত্র পড়ে থাকছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাতের বেলা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে/ছবি: জাগো নিউজ
প্রক্টরিয়াল টিমের টহল প্রয়োজন
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী হিমেলের দৃষ্টিতেও রাতের বেলা ক্যাম্পাসে বাতি বাড়ানো ইতিবাচক। তবে শুধু এই আলো দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।
হিমেল বলেন, ‘ক্যাম্পাসের যেসব জায়গায় অন্ধকারের কারণে ছিনতাই বা অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকি বেশি ছিল, সেখানে আলো থাকলে তা অবশ্যই কমবে। কিন্তু শুধু আলো থাকলেই যে দুর্ঘটনা বা অপরাধ ঘটবে না, এর নিশ্চয়তা কী?’
এজন্য রাতে প্রক্টরিয়াল টিমের নিয়মিত টহল আরও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে এই শিক্ষার্থী বলেন, রাতে প্রক্টরিয়াল টিমকে দায়িত্বের সঙ্গে পুরো ক্যাম্পাসে টহল দিতে হবে। তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি নিরাপদ, এমনটা বলা যাবে না। কারণ অপরাধ শুধু অন্ধকারেই ঘটে না, দিনের আলোতেও ঘটতে পারে।

ঢাবির ‘কালো দিবস’: ২০০৭ সালের সেই চার দিনে যা ঘটেছিল

ঢাবির শিক্ষক মূল্যায়নে অশোভন লেখা, ঢেকে দেওয়া হলো ওয়েবসাইট
নিরাপত্তার জন্য দরকার অন্যান্য ব্যবস্থাও
এ নিয়ে কথা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা জানান, সড়কবাতি সক্রিয় করার ক্ষেত্রে ডাকসু নয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবেই তা করেছে। তবে শুধু এটি দিয়ে ক্যাম্পাসে অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সর্বমিত্র চাকমা বলেন, ‘এতে ক্যাম্পাসে চুরি-ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধ সম্পূর্ণভাবে রোধ করা সম্ভব নয়। যদি সম্ভব হতো, তাহলে সূর্যের আলো থাকা সত্ত্বেও দিনদুপুরে কেন অপরাধ ঘটে? নিরাপত্তার জন্য আলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সঙ্গে অন্যান্য ব্যবস্থাও কার্যকর করতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জ্বলছে সড়কবাড়ি। ইনসেটে মাদক সেবন করছেন এক ভবঘুরে ব্যক্তি
যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
সড়কবাতি নিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনা চললেও একে নতুন কোনো প্রকল্প হিসেবে দেখছে না ঢাবি কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন বলেন, ক্যাম্পাসের রাস্তার পাশের লাইটগুলো প্রশাসনের কোনো নতুন উদ্যোগ নয়। এটা নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। নতুন করে কোনো লাইট লাগানো হয়নি।
তিনি জানান, পর্যবেক্ষণে কয়েকটি বাতি অচল এবং কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ থাকার বিষয়টি শনাক্ত করা হয়েছে। সেগুলো সংস্কারের কাজ চলছে।
আমরা ক্যাম্পাসে নতুন ডিজিটাল সিস্টেম ও এআইভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য কাজ করছি। এ বিষয়ে উপাচার্য এবং বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।- ঢাবি প্রক্টর ইসরাফিল রতন
আসছে এআইভিত্তিক সিসি ক্যামেরা
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রক্টর। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্যাম্পাসে নতুন ডিজিটাল সিস্টেম ও এআইভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য কাজ করছি। এ বিষয়ে উপাচার্য এবং বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।’
প্রক্টরের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘এআই সিস্টেমের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে কে প্রবেশ করছে এবং কে বের হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা যাবে। মানুষের চেহারা সিসিটিভিতে আরও স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব হবে। আগে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কারা ঘটিয়েছে, তাদের চেহারা সিসিটিভিতে ভালোভাবে দেখা যেতো না। ফলে অপরাধী শনাক্ত করা কঠিন হতো। এ কারণে উপাচার্যও ক্যাম্পাসে ডিজিটাল এআইভিত্তিক সিসিটিভি ব্যবস্থা স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।’
আরটি/একিউএফ/ এমএফএ

