প্রবাসে বাংলাদেশের গর্ব হয়ে ওঠার সেই স্মরণীয় দিন
কিছু দিন ক্যালেন্ডারের পাতায় শুধুই একটি তারিখ নয়; সময় পেরিয়ে সেগুলো হয়ে ওঠে জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তেমনই একটি দিন- যেদিন মেক্সিকো সরকারের মর্যাদাপূর্ণ ‘ওহটলি অ্যাওয়ার্ড’ এর তালিকায় প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের নাম।
মেক্সিকোর নাগরিকদের সেবা, সহযোগিতা এবং দেশটির সংস্কৃতি প্রচারে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ওই বছর এ সম্মাননা পান মিশরে দীর্ঘদিন কর্মরত বাংলাদেশি ও দেশটির জাগো নিউজ প্রতিনিধি আফছার হোসাইন।
২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মেক্সিকোর স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে কায়রোতে মেক্সিকান দূতাবাসের বাগানে বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মিশরে নিয়োজিত মেক্সিকোর তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জোসে অক্টাভিও ট্রিপ ‘ওহটলি অ্যাওয়ার্ড’ তুলে দিয়েছিলেন আফছার হোসাইন এর হাতে।

দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, মেক্সিকান নাগরিকদের সেবা ও সহযোগিতা এবং মেক্সিকান সংস্কৃতি প্রচারে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আফছার হোসাইনকে এই সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে। সে সময়ের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এশিয়া মহাদেশ থেকে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তিনি এই সম্মাননা লাভ করেন।
আফছার হোসাইন জানান, কায়রোতে মেক্সিকান দূতাবাসের বাগানে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানের কথা মনে পড়লে আজও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কূটনীতিক, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিতি এবং সম্মাননা গ্রহণের সেই বিশেষ মুহূর্ত।
করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সে সময় অনুষ্ঠানটি সীমিত পরিসরে আয়োজন করা হয়েছিল। স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মিশরে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মনিরুল ইসলামসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং মেক্সিকান কমিউনিটির প্রতিনিধিরা।
তিনি আরও জানান, একজন বাংলাদেশি হিসেবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলের এমন একটি আয়োজনে মেক্সিকো সরকারের এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা গ্রহণ ছিল আমার জন্য এক আনন্দ, আবেগ ও গর্বের মুহূর্ত।
আফছার হোসাইন, ১৯৯৫ সালে মেক্সিকোর দূতাবাসে চাকরির সুবাদে বাংলাদেশ থেকে মিশরে যান। নীলনদের তীরে শুরু হওয়া সেই প্রবাসজীবন দেখতে দেখতে পেরিয়েছে তিন দশকেরও বেশি সময়। দীর্ঘ এই সময়ে মিশরকে আপন করে নেওয়ার পাশাপাশি কাজের সূত্রে মেক্সিকোর মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে গড়ে ওঠে আমার গভীর সম্পর্ক। দায়িত্ব, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে মেক্সিকান কমিউনিটি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তৈরি হয় পারস্পরিক আস্থা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বললেন আফছার হোসাইন। তার ভাষায়, ‘ওহটলি অ্যাওয়ার্ড’ সেই দীর্ঘ পথচলারই একটি স্বীকৃতি।

১৯৯৬ সাল থেকে মেক্সিকো সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেক্সিকোর জনগণ, সংস্কৃতি ও স্বার্থের জন্য বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের এ সম্মাননা দিয়ে আসছে। দীর্ঘ মনোনয়ন ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার।
২০২০ সালে সেই সম্মাননার তালিকায় বাংলাদেশের নাম যুক্ত হওয়া তাই শুধু একজন বাংলাদেশির ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না; প্রবাসের মাটিতে দেশের জন্যও তা হয়ে উঠেছিল গর্বের একটি মুহূর্ত।
আফছার হোসাইনের হাতে যখন সম্মাননাটি তুলে দেওয়া হচ্ছিল, তখন ব্যক্তিগত আনন্দকে ছাপিয়ে তার মনে তৈরি হয়েছিল অন্যরকম এক অনুভূতি—তিনি একজন বাংলাদেশি এবং তার সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের নাম।
মেক্সিকো সরকারের এই সম্মাননা পাওয়ার খবর সে সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। ‘মেক্সিকোর শীর্ষ বেসামরিক সম্মাননা পেলেন বাংলাদেশি’—এমন শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে দেশের মানুষ জানতে পারেন আফছার হোসাইনের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কথা।

দেশের গণমাধ্যমে নিজের অর্জনের খবর প্রকাশিত হওয়াও তার কাছে ছিল বিশেষ আনন্দের। কারণ প্রবাসে একজন বাংলাদেশির সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত গর্বের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের পরিচয় ও মর্যাদাও।
ছয় বছর পর সেই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আফছার হোসাইন আরও বলেন, জীবনের কোনো অর্জনই একদিনে আসে না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ, নিষ্ঠা, মানুষের ভালোবাসা, সহকর্মীদের সহযোগিতা এবং অসংখ্য মানুষের দোয়া।
যারা তার সেই বিশেষ দিনে পাশে ছিলেন, শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এই অর্জনের খবর তুলে ধরেছিলেন—তাদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এমআরএম


