ইমিগ্রেশন ফাঁকি দিয়ে দিল্লি ছাড়লেন ৩ বিদেশি, ভারতে তোলপাড়
দিল্লি বিমানবন্দর থেকে বাধ্যতামূলক ইমিগ্রেশন ছাড়পত্র ছাড়াই মিউনিখগামী আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে উঠেছেন তিন বিদেশি নাগরিক। ঘটনাটি নিয়ে এয়ার ইন্ডিয়াকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়।
নোটিশের জবাব দিতে এয়ার ইন্ডিয়াকে সাতদিন সময় দেওয়া হয়েছে।
কীভাবে ইমিগ্রেশন ছাড়াই উড়োজাহাজে উঠলেন
ঘটনাটি ঘটে গত ৪ সেপ্টেম্বর ভোরে। তিন ইতালীয় নাগরিক রাত ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে এয়ার ইন্ডিয়ার AI-1115 ফ্লাইটে অমৃতসর থেকে দিল্লি পৌঁছান।
প্রায় এক ঘণ্টা পর রাত ১টা ৪৫ মিনিটে তারা লুফথানসার LH-763 ফ্লাইটে মিউনিখের উদ্দেশে দিল্লি ছাড়েন। তবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ওঠার আগে তারা বাধ্যতামূলক ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেননি।
ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের নোটিশে বলা হয়েছে, ঘটনাটি এয়ার ইন্ডিয়ার যাত্রী ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ত্রুটির বিষয়টি সামনে এনেছে।
অমৃতসরে দেওয়া হয়েছিল ‘ডি’ বোর্ডিং পাস
তিন যাত্রী এয়ার ইন্ডিয়ার ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ ব্যবস্থার আওতায় অমৃতসর থেকে দিল্লি যান। অমৃতসরে তাদের এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটের জন্য ‘ডি’ বা ডমেস্টিক বোর্ডিং পাস দেওয়া হয়।
একই সময় মিউনিখগামী লুফথানসার পরবর্তী ফ্লাইটের বোর্ডিং পাসও দেওয়া হয় তাদের। ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় এ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
এয়ার ইন্ডিয়ার প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা SOP অনুযায়ী বোর্ডিং পাসের দুটি শ্রেণি রয়েছে। ‘ডি’ ডমেস্টিক এবং ‘আই’ আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য।
নোটিশে বলা হয়েছে, ওই তিন যাত্রীর ক্ষেত্রে অনুসরণ করা প্রক্রিয়ার কোনো বিধান SOP-তে নেই।
আন্তর্জাতিক ট্রান্সফার এলাকায় কীভাবে গেলেন
দিল্লিতে পৌঁছানোর পর তিন যাত্রীকে আন্তর্জাতিক যাত্রী হিসেবে শনাক্ত করে ইমিগ্রেশনের দিকে পাঠানোর কথা ছিল।
কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নোটিশ অনুযায়ী, তাদের গেট ৩৯ থেকে ইন্টারন্যাশনাল-টু-ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সফার এলাকায় নেওয়া হয়।
সেখান থেকে তারা ইমিগ্রেশন চেকপয়েন্টে না গিয়েই আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের নির্ধারিত এলাকায় পৌঁছান। পরে লুফথানসার ফ্লাইটে উঠে মিউনিখের উদ্দেশে দিল্লি ছাড়েন।
এই ঘটনায় যাত্রীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে এয়ার ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
SOP-এর পাঁচটি বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ
ঘটনার সঙ্গে এয়ার ইন্ডিয়ার ডমেস্টিক-ইন্টারন্যাশনাল বা DI Operations SOP-এর পাঁচটি বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে মন্ত্রণালয়।
এর মধ্যে রয়েছে বোর্ডিং পাসের নির্ধারিত শ্রেণি অনুসরণ না করা। দিল্লিতে পৌঁছানোর পর ডমেস্টিক ও আন্তর্জাতিক যাত্রীদের আলাদা না করার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া শুধু ‘আই’ ক্যাটাগরির বোর্ডিং পাসধারী যাত্রীদের ইন্টারন্যাশনাল-টু-ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সফার ডেস্কে যাওয়ার কথা। ‘ডি’ বোর্ডিং পাস থাকা তিন যাত্রী সেখানে কীভাবে পৌঁছালেন, তা জানতে চেয়েছে মন্ত্রণালয়।
হাব ও স্পোক বিমানবন্দরে সার্বক্ষণিক নোডাল কর্মকর্তা ও মনিটরিং টিম রাখার বিধানও রয়েছে এয়ার ইন্ডিয়ার SOP-তে।
এই কর্মকর্তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ভুল পথে কোনো যাত্রী আন্তর্জাতিক প্রস্থান প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়ছেন কি না, তা নিশ্চিত করা। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এ ঘটনায় সেই নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করেনি।
ম্যানুয়াল যাচাইয়ে ধরা পড়ে ত্রুটি
ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত হয়নি। পরে ম্যানুয়াল রিকনসিলিয়েশনের সময় বিষয়টি ধরা পড়ে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভূমিকা নয়, পুরো যাত্রী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে ডমেস্টিক যাত্রী হিসেবে নথিভুক্ত তিনজন কীভাবে ইমিগ্রেশন ছাড়াই আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে উঠলেন, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
এয়ার ইন্ডিয়ার কাছে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে
তিন যাত্রী কীভাবে ‘ডি’ ক্যাটাগরির বোর্ডিং পাস নিয়ে আন্তর্জাতিক ট্রান্সফার এলাকায় প্রবেশ করলেন, তার ব্যাখ্যা চেয়েছে মন্ত্রণালয়।
অমৃতসরে তাদের লুফথানসার পরবর্তী ফ্লাইটের বোর্ডিং পাস কেন দেওয়া হয়েছিল, সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে।
যাত্রীদের ব্যবস্থাপনা ও স্থানান্তরে এয়ার ইন্ডিয়ার কর্মী এবং SATS-এর কর্মীদের ভূমিকা সম্পর্কেও তথ্য চাওয়া হয়েছে।
ঘটনার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত নোডাল কর্মকর্তা ও মনিটরিং টিম কোথায় ছিলেন এবং তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ডমেস্টিক ও আন্তর্জাতিক যাত্রীদের রিকনসিলিয়েশন যথাসময়ে কেন সম্পন্ন হয়নি, সেই ব্যাখ্যাও চেয়েছে মন্ত্রণালয়।
ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে General Declaration, passenger manifest এবং API-PNR তথ্য যথাসময়ে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সাতদিনের মধ্যে জবাব দিতে হবে
নির্ধারিত SOP অনুসরণে ব্যর্থতা এবং পর্যাপ্ত সতর্কতা না নেওয়ার কারণে কেন এয়ার ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে।
নোটিশ পাওয়ার সাতদিনের মধ্যে জবাব দিতে হবে উড়োজাহাজ সংস্থাটিকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না দিলে এয়ার ইন্ডিয়ার কোনো ব্যাখ্যা নেই বলে ধরে নেওয়া হতে পারে।
এরপর নথিপত্রের ভিত্তিতে প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে।
কী এই ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ ব্যবস্থা
হাব অ্যান্ড স্পোক ব্যবস্থায় ছোট বা আঞ্চলিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রীদের বড় একটি বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তারা আন্তর্জাতিক গন্তব্যের ফ্লাইটে ওঠেন। যেমন- অমৃতসর থেকে কোনো যাত্রী দিল্লি হয়ে মিউনিখ যেতে পারেন।
তবে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর ওই যাত্রীকে আন্তর্জাতিক যাত্রী হিসেবে শনাক্ত করতে হয়। এরপর নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে হয়।
এই ঘটনাকে ঘিরে মূল প্রশ্ন হলো, সেই বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া এড়িয়ে তিন বিদেশি নাগরিক কীভাবে দিল্লি থেকে মিউনিখগামী আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে উঠতে পারলেন।
সূত্র: এনডিটিভি
কেএএ/








