স্বপ্নের দামে স্বর্গসুখ
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। যা হয়তো আপনি আজীবন কল্পনা করেছেন, স্বপ্নে দেখেছেন, কখনো জেগে থেকেও চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে চেয়েছেন, সেই স্বর্গের মতো সুখী জীবনটি যদি একদিন হঠাৎ আপনার দরজায় এসে দাঁড়ায়? ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, চারপাশটা ঠিক আগের মতোই আছে, অথচ আপনার ভেতরটা বদলে গেছে।
বুকের ওপর জমে থাকা অদৃশ্য পাথরটি নেই, মাথার ভেতর ঘুরপাক খাওয়া দুশ্চিন্তাগুলো নেই, গতকালের কষ্টগুলো যেন অনেক দূরের কোনো গল্প। জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হলো, পৃথিবীটা এত সুন্দর ছিল, অথচ এতদিন আপনি তা দেখতে পাননি।
কীভাবে সম্ভব? কোথায় যাবেন? কী চাইবেন? চলুন, আজ কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতার হিসাবটা পাশে রেখে অনুভূতির এক ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। এখানে আপনাকে কেউ জিজ্ঞেস করবে না, আপনার কত টাকা আছে, কী হারিয়েছেন, কোথায় ব্যর্থ হয়েছেন, কিংবা জীবনে কতবার কেঁদেছেন। এখানে শুধু একটি প্রশ্ন, আপনি কী চান?
বলুন, কী চাই? এক কাপ চা? নাকি গাঢ় সুগন্ধের কফি? অথবা এমন কোনো অমৃতের স্বাদ, যার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো পানীয়ের তুলনা চলে না? আপনি যা চাইবেন, তাই যেন আপনার সামনে হাজির। চায়ের কাপটি হাতে নিতেই তার সঙ্গে মিশে যাবে ভোরের মাটির গন্ধ, দূরের পাখির ডাক আর এমন এক প্রশান্তি, যার কথা আপনি হয়তো বহুদিন ভুলে গেছেন। কফি চাইলে তার গন্ধে যেন পাহাড়ি সকালের উষ্ণতা। আর যদি সেই অমৃত চান, এক চুমুকেই মনে হবে, এতদিন যে স্বাদের খোঁজে ছিলেন, সেটি হয়তো আপনার জিভে নয়, আপনার স্মৃতির কোনো অচেনা কোণে লুকিয়ে ছিল।
কোথায় যাচ্ছি, এখনই জানতে চাইবেন না। শুধু আমার সঙ্গে কয়েক পা হাঁটুন। চারপাশে অন্ধকার। এত গভীর অন্ধকার যে নিজের হাতটিও ঠিকমতো দেখা যায় না। কিন্তু ভয় পাবেন না। দূরে কোথাও অদ্ভুত এক আলো দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ঘন জঙ্গলের বুক চিরে কেউ যেন একটি পথ রেখে দিয়েছে। বাতাসে অচেনা ফুলের গন্ধ। কোথাও অদৃশ্য কোনো পাখি ডাকছে। পাতার ওপর শিশির জমে আছে। পায়ের নিচে নরম মাটি। যত এগিয়ে যাচ্ছেন, আলোটা তত পরিষ্কার হচ্ছে।
আর হঠাৎ…
জঙ্গল শেষ।
আপনার সামনে খুলে গেল এমন এক দৃশ্য, যা হয়তো পৃথিবীর কোনো ছবিতেও পুরোপুরি আঁকা সম্ভব নয়। দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়, তার নিচে নীলাভ হ্রদ। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে সরু জলপ্রপাত। আকাশে ভোরের প্রথম আলো। চারপাশে এমন নিস্তব্ধতা, যেখানে নিজের হৃদস্পন্দনও শোনা যায়। আপনি থেমে গেলেন। আমি শুধু বললাম, “কেমন লাগছে?” আপনি হয়তো কোনো উত্তর দিতে পারবেন না। কারণ এমন সৌন্দর্যের সামনে ভাষা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।
আপনি যদি বলেন, “আমি সমুদ্র দেখতে চাই।” চোখ ফেরাতেই পাহাড়ের জায়গায় দেখা যাবে অসীম নীল সমুদ্র। ঢেউ এসে আপনার পায়ের কাছে ভেঙে পড়ছে। নরম বালুর ওপর আপনি খালি পায়ে হাঁটছেন। বাতাসে লবণের গন্ধ, দূরে সূর্য ধীরে ধীরে জলের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে।
আপনি যদি বলেন, “না, আমি পাহাড়েই থাকতে চাই।” তাহলে আবার ফিরে আসবে সেই পাহাড়। কুয়াশা নেমে আসবে উপত্যকায়। দূরে কোনো কাঠের ঘর থেকে ধোঁয়া উঠবে। মনে হবে, পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থেকে আপনি বহু দূরে চলে এসেছেন।
আর যদি বলেন, “আমি শুধু একটু শান্তি চাই।” তাহলে এবার কোনো দৃশ্য বদলাবে না। শুধু চারপাশের সব শব্দ ধীরে ধীরে থেমে যাবে।
আপনি বুঝতেও পারবেন না কখন এই ভ্রমণটি আপনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা থেকে আপনার নিজের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর দিকে নিয়ে গেছে। হঠাৎ মনে পড়বে সেই মানুষটির কথা, যাকে আপনি বহুদিন আগে হারিয়েছেন। সে হয়তো আপনার বাবা, মা, কোনো প্রিয় বন্ধু, কিংবা এমন কেউ, যার সঙ্গে আর কোনোদিন কথা বলা সম্ভব হয়নি। আপনি তাকিয়ে দেখবেন, সে আপনার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। আপনি তার হাত ধরবেন। কিছু বলার প্রয়োজন হবে না। হয়তো চোখের জলই অনেক কথা বলে দেবে।
এখানে সময়ের কোনো দেয়াল নেই। অতীত আর বর্তমানের মাঝেও কোনো দরজা নেই। আপনি চাইলে ফিরে যেতে পারেন আপনার শৈশবে, সেই বয়সে যখন একটি বিকেলই ছিল আনন্দের জন্য যথেষ্ট। মাঠের ওপর দিয়ে দৌড়াবেন, বৃষ্টিতে ভিজবেন, কাদায় পা ডোবাবেন, কোনো কারণ ছাড়াই হাসবেন। তখন বুঝতে পারবেন, সুখ কখনো খুব বড় কোনো জিনিস ছিল না। আমরা বড় হতে হতে তাকে জটিল করে ফেলেছি।
এখানে আপনার কোনো দুঃস্বপ্ন নেই। আছে স্বপ্ন। কোনো ভয় নেই। আছে কৌতূহল। কোনো অভিযোগ নেই। আছে কৃতজ্ঞতা। আর কোনো তাড়া নেই। আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই থাকার মতো যথেষ্ট সময় আছে।
কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। এই পৃথিবীতে আপনি যত বেশি কিছু চাইবেন, তত বেশি কিছু আপনার সামনে আসবে না। বরং ধীরে ধীরে আপনি বুঝতে শুরু করবেন, আপনার আসল চাওয়া কত সামান্য। হয়তো আপনি আর প্রাসাদ চাইছেন না, শুধু এমন একটি ঘর চাইছেন যেখানে সন্ধ্যায় ফিরে এসে শান্তিতে বসতে পারেন। কোটি টাকা চাইছেন না, শুধু এমন কিছু মানুষ চাইছেন যারা আপনাকে ভালোবাসে। দীর্ঘ জীবন চাইছেন না, শুধু বেঁচে থাকা প্রতিটি দিনকে অর্থপূর্ণ করতে চাইছেন।
হঠাৎ আপনি খেয়াল করবেন, আপনার পাশে যে মানুষটি এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল, সে আপনাকে বলছে, “তুমি এতদিন সুখ খুঁজতে কোথায় কোথায় গেলে? সুখ তো তোমার কাছেই ছিল।” আপনি অবাক হয়ে তাকাবেন। সে হাসবে। “তুমি শুধু দেখতে পাওনি।”
হয়তো তখনই আপনার মনে হবে, এই জায়গাটি কোথাও বাইরে নয়। কোনো দূর দেশের পাহাড়ে নয়, কোনো বিলাসবহুল দ্বীপে নয়, কোনো রাজপ্রাসাদেও নয়। এই জায়গাটি আপনার নিজের ভেতরেই ছিল। শুধু দুঃস্বপ্ন, দুশ্চিন্তা, অভিমান, ভয় আর না-পাওয়ার হিসাব এত বেশি জায়গা দখল করে রেখেছিল যে, সেখানে সুখের জন্য একটু জায়গাও অবশিষ্ট ছিল না।
তাই আজ, যখন মনটা খুব ক্লান্ত হয়ে যাবে, যখন পৃথিবীটাকে অসহ্য মনে হবে, যখন মনে হবে কেউ আপনাকে বুঝছে না, তখন একটু থামুন। চোখ বন্ধ করুন। গভীরভাবে শ্বাস নিন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, “আমি আসলে কী চাই?” তারপর উত্তরটির দিকে হাঁটতে শুরু করুন।
হয়তো আপনি কোথাও যাবেন না। আপনার ঘরেই থাকবেন। আপনার চায়ের কাপটিও আগের মতোই থাকবে। জানালার বাইরের পৃথিবীও বদলাবে না। কিন্তু আপনি যদি নিজের ভেতরের দরজাটা একটু খুলে দেন, তাহলে দেখবেন, সেই দরজার ওপাশে একটি ছোট্ট পৃথিবী অপেক্ষা করছে, যেখানে আপনি আবার স্বপ্ন দেখতে পারেন।
সেই পৃথিবীর প্রবেশমূল্য কত? কিছুই না। শুধু একটু সময়, একটু কল্পনা, আর নিজের প্রতি একটু মমতা।
হয়তো এখানেই আমাদের এই স্বপ্নের ভ্রমণ থেকে ফিরে এসে একটু থামা দরকার। কারণ মানুষের জীবনে এমন সময় আসতেই পারে, যখন চারপাশের সব দরজা একে একে বন্ধ হয়ে যায়। প্রিয় মানুষকে হারাতে হয়, নিজের ওপর বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে যায়, দীর্ঘদিনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হয়। তখন মনে হতে পারে, আর কোনো পথ নেই।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের অন্য একটি কথা বলে। ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, রাসুলুল্লাহ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনেও এমন এক গভীর দুঃসময় এসেছিল। মক্কার সেই কঠিন সময়ে তিনি হারিয়েছিলেন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.)-কে, হারিয়েছিলেন তাঁর চাচা আবু তালিবকে, যিনি তাঁকে দীর্ঘদিন রক্ষা ও সমর্থন করেছিলেন। এরপর তায়েফে গিয়েও তিনি প্রত্যাখ্যাত ও নির্যাতিত হন। সেই সময়টিকে ইসলামী ঐতিহ্যে ‘আমুল হুযন’, অর্থাৎ দুঃখের বছর, বলা হয়।
আর সেই গভীর সংকটের সময়ের পরই আসে ইসরা ও মিরাজের সেই মহান রাত, যে রাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর প্রিয় নবী (সা.)-কে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে আসমানের উচ্চতম স্তরে নিয়ে যান। ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, এই অসাধারণ যাত্রার মধ্যেই পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিধানও দেওয়া হয়।
এখানে আমাদের জন্য একটি গভীর শিক্ষা আছে। মিরাজ আমাদের জন্য পুনরাবৃত্তি করার মতো কোনো ঘটনা নয়, কারণ এটি ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ মুজিজা। কিন্তু মিরাজের আগে যে অন্ধকার সময় এসেছিল, তার পরেও আল্লাহর পক্ষ থেকে যে আলো এসেছিল, সেই শিক্ষাটি আমাদের সবার জন্য।
অন্ধকার মানেই পথ শেষ হয়ে গেছে, তা নয়। কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাতের পরেই মানুষের সামনে নতুন ভোরের দরজা খুলে যায়। যে দরজাটি আজ বন্ধ মনে হচ্ছে, তার ওপারে হয়তো এমন একটি পথ অপেক্ষা করছে, যার কথা আপনি এখনো কল্পনাও করতে পারছেন না।
তাই দুঃস্বপ্নকে সত্যি বলে মেনে নেবেন না। দুশ্চিন্তাকে ভবিষ্যতের ভবিষ্যদ্বাণী ভাববেন না। আজকের ব্যর্থতাকে জীবনের শেষ অধ্যায় মনে করবেন না।
একটু থামুন। নিজের ভেতরে ফিরে তাকান। প্রার্থনায় দাঁড়ান। আশা ধরে রাখুন। আপনার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যান। আর মনে রাখুন, কষ্টের সময়টি আপনার পুরো জীবন নয়, এটি আপনার জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র।
হয়তো আপনার মিরাজ হবে না। আমারও হবে না। কিন্তু আপনার জীবনে এমন একটি সকাল আসতেই পারে, যেদিন ঘুম থেকে উঠে আপনি দেখবেন, যে জীবনটাকে একসময় অসহ্য মনে হয়েছিল, সেই জীবনেই আবার আলো ফিরে এসেছে।
আর তখন হয়তো আপনি পেছনে ফিরে তাকিয়ে বলবেন, “সেদিন আমি ভেবেছিলাম সব শেষ। অথচ সেদিনই হয়তো আমার নতুন পথের শুরু হয়েছিল।”
তাই চলুন, স্বপ্ন দেখা বন্ধ না করি। কারণ কখনো কখনো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে শুধু তার আজকের বাস্তবতা নয়, আগামী দিনের একটি সুন্দর সম্ভাবনার স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের দরজাটি হয়তো এখনো খোলা আছে। শুধু আপনাকেই সেখানে পৌঁছানোর জন্য আরেকটু পথ হাঁটতে হবে।
রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
ই-মেইল: rahman.mridha@gmail.com
এমআরএম



