বাবা জানতেও পারেননি ছেলে প্রধানমন্ত্রী, অ্যান্ডির পিতৃবিয়োগ
কিছু অর্জন ব্যক্তিগত থাকে না, হয়ে ওঠে পুরো পরিবারের। কিন্তু সেই অর্জনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তে যদি পাশে না থাকেন বাবা, তখন আনন্দের সঙ্গে মিশে যায় এক গভীর শূন্যতা। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের জীবনে এমনই এক আবেগঘন অধ্যায়।
দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দায়িত্বে আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তিনি হারালেন তার বাবা রয় বার্নহ্যামকে। দীর্ঘদিন স্মৃতিভ্রংশজনিত রোগে ভুগছিলেন রয়। এমনকি ছেলে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন- শেষ সময়ে সেই খবরটিও তিনি আর বুঝতে পারেননি।
বাবার মৃত্যুর খবর আসে ১৪ সেপ্টেম্বর। এরপর ব্যক্তিগত শোকের কারণে দুই দিনের জন্য সরকারি প্রকাশ্য কর্মসূচি থেকে নিজেকে বিরত রাখেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। সোমবার ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক এবং মঙ্গলবার ব্রাইটনে শ্রমিক সংগঠনগুলোর বার্ষিক সম্মেলনে তার বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। দুটিই বাতিল করা হয়।
রয় বার্নহ্যাম ছিলেন পেশায় দূরভাষ প্রকৌশলী। স্ত্রী আইলিনকে নিয়ে ইংল্যান্ডের চেশায়ারের কালচেথে তিন ছেলেকে বড় করেছেন তিনি। ছেলের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে এমন এক পরিবারের ছবি, যেখানে হাসি, ভালোবাসা ও উৎসাহ ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী।
অ্যান্ডির রাজনৈতিক জীবনে বাবার প্রভাবও ছিল গভীর। বাবার অসুস্থতা এবং তার দেখভালের অভিজ্ঞতা থেকেই সমাজের বয়স্ক ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পরিচর্যা ব্যবস্থা সংস্কারের প্রতি অ্যান্ডির আগ্রহ আরও দৃঢ় হয়। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি বারবার বলেছেন, নিজের পরিবারের অভিজ্ঞতা তাকে এই বিষয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।
তবে অ্যান্ডির জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়গুলোর একটি ছিল- ছেলের এত বড় অর্জনের খবর বাবাকে জানাতে না পারা। স্মৃতিভ্রংশজনিত রোগের কারণে রয় বুঝতে পারেননি, তার ছেলে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।
তবু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের সেই দিন বাবাকে একেবারে দূরে রাখা হয়নি। পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা রয়কে কর্মীরা টেলিভিশনে ছেলের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে প্রবেশের দৃশ্য দেখিয়েছিলেন। অ্যান্ডি পরে সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। পরিচর্যাকারীদের উদ্যোগে তৈরি সেই ছোট্ট মুহূর্তটি তার কাছে হয়ে উঠেছিল অসাধারণ এক স্মৃতি।
বাবার অসুস্থতা অ্যান্ডির কাছে শুধু পারিবারিক কষ্ট ছিল না; তা তার রাজনৈতিক চিন্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। পরিচর্যা ব্যবস্থার সংস্কারের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে তিনি নিজের বাবার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে বাবার দেখভাল করা কর্মীদের দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতারও প্রশংসা করেছেন।
অ্যান্ডির শৈশবও ছিল পরিবারের ঘনিষ্ঠতার গল্পে ভরা। বাবা-মা নিজেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ না পেলেও সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। তাদের সীমিত সুযোগ যেন সন্তানদের জন্য আরও বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার স্বপ্নকে আরও শক্তিশালী করেছিল।
রাজনীতির বাইরে রয় ছিলেন তার ছেলের কাছে একজন স্নেহশীল বাবা। আর রাজনীতিতে অ্যান্ডি যত ওপরে উঠেছেন, ততই বাবার জীবনের শিক্ষা ও পারিবারিক অভিজ্ঞতা তার ভাবনায় ফিরে এসেছে।
রয়ের মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও এসেছে শোকবার্তা। ভিন্ন রাজনৈতিক মতের নেতারাও অ্যান্ডি বার্নহ্যামের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। কারণ রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বাইরে বাবা হারানোর বেদনা সবার কাছেই মানবিক এক অনুভূতি।
একজন বাবা হয়তো জীবনের শেষ সময়ে বুঝতে পারেননি, তার ছেলে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু ছেলের সেই অর্জনের পেছনে তার ভালোবাসা, উৎসাহ ও পারিবারিক শিক্ষার যে বড় ভূমিকা ছিল, সেটি অ্যান্ডি বার্নহ্যামের স্মৃতিতে থেকে যাবে।
তাই রয় বার্নহ্যামের বিদায় শুধু একজন প্রবীণ বাবার মৃত্যু নয়। এটি এমন এক মানুষের বিদায়, যার জীবনের গল্প নীরবে প্রভাব ফেলেছে যুক্তরাজ্যের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক চিন্তা এবং সমাজের মানুষের জন্য তার স্বপ্নে। বাবার শূন্যতা হয়তো কোনো অর্জন দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়; তবে তার রেখে যাওয়া মূল্যবোধই হয়ে থাকবে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার।
এমআরএম

