সেপসিস: সাধারণ সংক্রমণ যখন হয়ে ওঠে জীবনসংকট

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
একজন প্রবীণ রোগীর কয়েক দিন ধরে প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া ও সামান্য জ্বর ছিল। পরিবারের সবাই ভেবেছিলেন, এটি সাধারণ প্রস্রাবের সংক্রমণ—ওষুধ খেলেই ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু এক রাতে তিনি হঠাৎ এলোমেলো কথা বলতে শুরু করলেন। শ্বাস দ্রুত হয়ে গেল, শরীর ঠান্ডা ও ঘামযুক্ত মনে হলো। হাসপাতালে নেওয়া...

একজন প্রবীণ রোগীর কয়েক দিন ধরে প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া ও সামান্য জ্বর ছিল। পরিবারের সবাই ভেবেছিলেন, এটি সাধারণ প্রস্রাবের সংক্রমণ—ওষুধ খেলেই ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু এক রাতে তিনি হঠাৎ এলোমেলো কথা বলতে শুরু করলেন। শ্বাস দ্রুত হয়ে গেল, শরীর ঠান্ডা ও ঘামযুক্ত মনে হলো। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা গেল, তিনি সেপসিসে আক্রান্ত হয়েছেন।

এ ধরনের ঘটনা বিরল নয়। সংক্রমণকে আমরা অনেক সময় ছোট সমস্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিক্রিয়াই এত তীব্র ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে যে শরীর নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে শুরু করে। এই জীবনসংকটপূর্ণ অবস্থার নাম সেপসিস।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ মানুষ সেপসিসে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু এর সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এর বোঝা বেশি। অথচ দ্রুত লক্ষণ শনাক্ত করে জরুরি চিকিৎসা শুরু করা গেলে অনেক জীবন রক্ষা করা সম্ভব।

সেপসিস কি শুধু রক্তে জীবাণু?

অনেকে সেপসিসকে “রক্তে জীবাণু” বা “রক্তে বিষক্রিয়া” বলে থাকেন। কিন্তু বিষয়টি আরও বিস্তৃত। সেপসিসে জীবাণুর পাশাপাশি সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রতিক্রিয়ায় রক্তচাপ কমে যেতে পারে এবং মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র, ফুসফুস, কিডনি ও লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে পারে।

নিউমোনিয়া, প্রস্রাবের সংক্রমণ, পেটের ভেতরের সংক্রমণ, পিত্তনালির সংক্রমণ, ত্বক বা ক্ষতের সংক্রমণ—এসব থেকে সেপসিস হতে পারে। অস্ত্রোপচার বা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরও কখনো গুরুতর সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।

ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা পরজীবী—বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ থেকে সেপসিস সৃষ্টি হতে পারে। তাই সেপসিস মানেই যে একটি নির্দিষ্ট জীবাণু বা রোগ, তা নয়।

কোন লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত?

সেপসিসের শুরু সব সময় একই রকম হয় না। কারও প্রচণ্ড জ্বর হতে পারে, আবার প্রবীণ বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন রোগীর জ্বর নাও থাকতে পারে। কয়েকটি লক্ষণ বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে—

* হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়া বা অসংলগ্ন কথা বলা
* শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা অস্বাভাবিক দ্রুত শ্বাস নেওয়া
* হৃদ্‌স্পন্দন খুব দ্রুত হওয়া বা নাড়ি দুর্বল মনে হওয়া
* জ্বর, প্রচণ্ড কাঁপুনি অথবা অস্বাভাবিক ঠান্ডা লাগা
* ত্বক ঠান্ডা, ফ্যাকাশে, ঘামযুক্ত বা ছোপছোপ হয়ে যাওয়া
* প্রচণ্ড ব্যথা বা এমন অসুস্থ বোধ করা, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি
* প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া
* অতিরিক্ত দুর্বলতা, ঘুমঘুম ভাব বা জাগাতে কষ্ট হওয়া

একটি লক্ষণ দেখলেই যে সেপসিস হয়েছে, তা বলা যায় না। তবে কারও সংক্রমণ আছে বা সম্প্রতি সংক্রমণ হয়েছে এবং তার সঙ্গে এ ধরনের দ্রুত অবনতি দেখা দিলে সেপসিসের কথা ভাবতে হবে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

সেপসিস যে কারও হতে পারে। তবে নবজাতক ও ছোট শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী ও সদ্য সন্তান প্রসবকারী নারী, ডায়াবেটিস বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি-লিভারের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ক্যানসারের চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ঝুঁকি বেশি।

যাঁদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, যাঁদের শরীরে ক্যাথেটার বা অন্য কোনো চিকিৎসা-যন্ত্র রয়েছে এবং যাঁরা সম্প্রতি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বা বড় অস্ত্রোপচার করিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

পরিবারের করণীয় কী?

সেপসিস ঘরে বসে চিকিৎসা করার রোগ নয়। রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাঁকে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীকে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে—কোথায় সংক্রমণ ছিল, কখন থেকে সমস্যা শুরু হয়েছে এবং রোগীর আচরণ, শ্বাসপ্রশ্বাস বা প্রস্রাবের পরিমাণে কী পরিবর্তন এসেছে।

প্রয়োজনে একটি সরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা যায়—
“রোগীর সংক্রমণ আছে। এটি কি সেপসিস হতে পারে?”

হাসপাতালে চিকিৎসকেরা রোগীর রক্তচাপ, শ্বাসপ্রশ্বাস, অক্সিজেনের মাত্রা, রক্ত ও অন্যান্য পরীক্ষা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করেন। সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস অনুযায়ী দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য চিকিৎসা, শিরায় তরল এবং প্রয়োজনে অক্সিজেন ও নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়।

নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে হাসপাতালে যেতে দেরি করা উচিত নয়। আবার ভাইরাসজনিত সাধারণ রোগে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াও সঠিক নয়। অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জীবাণুর ওষুধপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ভবিষ্যতের গুরুতর সংক্রমণের চিকিৎসাকে কঠিন করে তুলতে পারে।

সেপসিস কি প্রতিরোধ করা যায়?

সব সেপসিস প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যায়। সময়মতো প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া, নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখা, কাটা বা ক্ষত পরিষ্কার ও ঢেকে রাখা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসকের দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিক নির্ধারিত নিয়মে গ্রহণ করতে হবে। কোনো সংক্রমণ চিকিৎসার পরও উন্নতি না হলে বা নতুন করে শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি কিংবা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত পুনরায় চিকিৎসা নিতে হবে।

সেপসিসে সময় অত্যন্ত মূল্যবান। রোগীর অবস্থা দ্রুত বদলে যেতে পারে। তাই সচেতনতার মূল কথা আতঙ্ক সৃষ্টি করা নয়; বরং বিপদের লক্ষণগুলো চিনে সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

একটি সাধারণ সংক্রমণের সঙ্গে যদি রোগীর আচরণ, শ্বাসপ্রশ্বাস বা সামগ্রিক অবস্থার হঠাৎ পরিবর্তন ঘটে, অপেক্ষা করবেন না। দ্রুত চিকিৎসা নিন এবং প্রশ্ন করুন—“এটি কি সেপসিস হতে পারে?” এই একটি প্রশ্ন কখনো একটি জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।

লেখক: কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, অরল্যান্ডো হেলথ, ফ্লোরিডা শিক্ষক, গবেষক, লেখক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক।

এইচআর/এএসএম

Original Source
https://www.jagonews24.com/opinion/article/1157362
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in World