সমকামিতা সম্পর্কে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা কী বলছে, এর শাস্তি কী?
বাংলাদেশে সমকামিতা নিয়ে আলোচনা হলেই সামনে আসে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা। তবে এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি ৩৭৭ ধারা বাংলাদেশের সংবিধানের কোনো ধারা নয়। এটি ব্রিটিশ আমলে প্রণীত দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (The Penal Code, 1860)-এর একটি ধারা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি আবাসিক হলে সমকামিতার অভিযোগ ঘিরে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের আইনে এ বিষয়ে আসলে কী বলা আছে এবং শাস্তির বিধান কী।
৩৭৭ ধারায় কী বলা হয়েছে?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আইনে ‘সমকামিতা’ শব্দটির আলাদা কোনো সংজ্ঞা নেই। অর্থাৎ, প্রচলিত আইনে সমকামিতাকে পৃথক কোনো অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি।
তবে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় ‘প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে’ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ধারাটিতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো পুরুষ, নারী বা পশুর সঙ্গে প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে তিনি শাস্তির মুখে পড়তে পারেন।
এই ধারার অধীনে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ড হতে পারে। একইসঙ্গে, ওই ব্যক্তি অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাহলে সমকামিতার জন্যই কি ৩৭৭ ধারায় শাস্তি?
এখানেই বিষয়টি কিছুটা জটিল। আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবালের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘দ্য পেনাল কোড, ১৮৬০, আইনে ৩৭৭ এ ‘আন-ন্যাচারাল অফেন্সেস’ এর বিষয়ে বলা আছে। এখানে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের কথাও বলা হয়েছে।’
তবে বাংলাদেশে আইনিভাবে শারীরিক সম্পর্কের এই ধারণাটিকে স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি কোনোটিই দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ ৩৭৭ ধারায় ‘সমকামিতা’ শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি এবং এর কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞাও নেই। ধারাটিতে মূলত ‘আন-ন্যাচারাল অফেন্সেস’ বা প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ অপরাধের কথা বলা হয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, এই ধারায় কোনো অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে শারীরিক সম্পর্কের সময় পেনিট্রেশন বা অনুপ্রবেশকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। তবে মামলার তথ্য-প্রমাণ ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে আদালত ঠিক করবেন কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে যাবজ্জীবন, নাকি সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।
অর্থাৎ, ৩৭৭ ধারাকে শুধু ‘সমকামিতা নিষিদ্ধ করার আইন’ হিসেবে সরলভাবে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হয় না। কারণ ধারাটিতে সমকামিতার আলাদা সংজ্ঞা নেই। মূলত, সমকামিতার বিষয়ে আমাদের এখানে কোনো আইন নাই। এটার সংজ্ঞাও দেওয়া হয় নাই। এই টার্মটাই নাই। আমাদের এখানে আছে ‘আন-ন্যাচারাল’ এই বিষয়টা।
বাংলাদেশে এ ধরনের মামলা হয়েছে কি?
আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল জানিয়েছেন, তার জানা মতে, শুধু সম্মতিসূচক সমলিঙ্গের সম্পর্কের কারণে ৩৭৭ ধারায় মামলা বা শাস্তির ঘটনা তার জানা নেই। তবে ৩৭৭ ধারায় মামলা খুঁজলে কিছু মামলা পাওয়া যেতে পারে, যার বেশিরভাগই বলাৎকার বা জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে বলাৎকারের মামলাতেও ৩৭৭ ধারা ব্যবহার করা হতো। পরে দেশের আইনে বলাৎকারকে সংজ্ঞায়িত করে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সমকামিতা নিয়ে আলাদা কোনো আইন না থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য আইনের ধারাও প্রয়োগ করতে পারে। অশ্লীলতার মতো অভিযোগের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন আইনি ধারা ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে বলে তিনি জানান।
৩৭৭ ধারার শাস্তি কত?
দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় নির্ধারিত শাস্তি হলো অপরাধ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, পাশাপাশি অর্থদণ্ডও হতে পারে। তবে কোনো অভিযোগ উঠলেই এই শাস্তি হয়ে যায় না। অভিযোগের ধরন, ঘটনার প্রমাণ, পরিস্থিতি এবং আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
উপনিবেশিক আমলের আইন থেকে বর্তমান বাংলাদেশ
৩৭৭ ধারার ইতিহাস ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের সঙ্গে যুক্ত। ইংল্যান্ডে ১৫৩৩ সালে রাজা অষ্টম হেনরির আমলে ‘Buggery Act 1533’ পাস হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশগুলোতে একই ধরনের ‘প্রকৃতিবিরুদ্ধ’ যৌন আচরণকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আইন প্রণয়ন করে। সেই ধারাবাহিকতায় ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধিতেও ৩৭৭ ধারা যুক্ত হয়।
বর্তমানে এশিয়ার কয়েকটি দেশেও ব্রিটিশ আমলের এমন আইনের প্রভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৮ সালের এক রায়ের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আমলের ৩৭৭ ধারার সমলিঙ্গের সম্মতিসূচক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রয়োগ বাতিল করে। অর্থাৎ ভারতে বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক দুজন মানুষের পারস্পরিক সম্মতিতে, ব্যক্তিগতভাবে সমলিঙ্গের যৌন সম্পর্ক অপরাধ নয়।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সমকামিতা শব্দটির আলাদা সংজ্ঞা দণ্ডবিধিতে নেই, তবে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় ‘প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে’ যৌন সম্পর্কের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তাই কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে ঠিক কোন আইনের কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা ঘটনার ধরন ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।
সূত্র: বিবিসি
কেএসকে


