বাইকের সংখ্যা বাড়ায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে: জাহেদ উর রহমান
দেশে বাইকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনায় বাইকারদের মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, শুধু মৃত্যুই নয়, বাইক দুর্ঘটনায় প্রচুর মানুষ আহতও হচ্ছেন। তাই বাইকারদের আরও সতর্কভাবে যান চালানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখতে হবে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক অভিযোগ করেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অধিকাংশের মালিক পুলিশ কর্মকর্তা। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরাই রাস্তায় দায়িত্ব পালন করছেন। সরকার অবৈধ অটোরিকশার কথা বললেও সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে বাইকারদের কাগজপত্র যাচাইয়ে পুলিশকে বেশি তৎপর দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়-ঝক্কড় বাসের বিরুদ্ধেও অভিযান দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন ওই সাংবাদিক।
এই প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, পুলিশ কর্মকর্তারা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের মালিক, এমন ‘সুইপিং স্টেটমেন্ট’ যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া দেওয়া ঠিক নয়। এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, আপনি যদি তথ্য-প্রমাণ দিয়ে যেকোনো রিপোর্ট করেন, আমি এটাকে এনকারেজ করছি। আপনার এই তথ্যটাকে আমি উড়িয়ে দিচ্ছি তা বলছি না, কিন্তু আপনি যখন পাবলিক জায়গায় বলছেন, আপনার একটু গ্রাউন্ড থাকা লাগবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার ডিসইনফরমেশনের বিষয়ে কঠোর থাকবে। তবে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে করা প্রতিবেদনকে সরকার উৎসাহিত করবে।
অটোরিকশা নিয়ে নীতিমালা হচ্ছে
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব যানবাহন বৈধ না অবৈধ এভাবে বিষয়টি দেখলে রাস্তায় থাকা প্রায় প্রতিটি অটোরিকশাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই এ বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অটোরিকশার সঙ্গে অনেক মানুষের জীবিকা ও যাতায়াত জড়িত। মানুষ এসব যানবাহনের মাধ্যমে সহজে চলাচল করতে পারছে। ফলে হুট করে সব অটোরিকশা বন্ধ না করে নীতিমালার মাধ্যমে কোথায় এগুলো চলবে এবং কীভাবে নিরাপদ রাখা যাবে, তা নির্ধারণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আমরা এদের এলিমিনেটও করতে চাই না। আমরা চাই তারা কোথায় কোথায় থাকবেন, তাদের বাহনটি সেফটিওয়াইজ হবে।
শুধু বাইক নয়, সব যানবাহনের কাগজপত্র যাচাই
বাইকারদের কাগজপত্র যাচাইয়ের বিষয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, বাইকের কাগজপত্র যাচাইয়ে সমস্যার কিছু নেই। তবে শুধু বাইক নয়, রাস্তায় চলাচলকারী সব ধরনের যানবাহনের কাগজপত্র যাচাই করা দরকার।
তিনি বলেন, সবগুলো, বাইকসহ যত যত বাহন আছে সবকিছু যাচাই করা দরকার। পুলিশকে বাইকারদের কাগজপত্র যাচাই করতে বলা হবে এবং একই সঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ সময় বাইকারদের সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে বাইকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনায় বাইকারদের মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। শুধু মৃত্যু নয়, প্রচুর মানুষ আহত হন।
নিজের চিকিৎসক হিসেবে অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাইক দুর্ঘটনা খুব খারাপ হতে পারে। কারণ মানুষ পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেতে পারেন। তাই বাইকারদের সতর্কভাবে বাইক চালানো এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
ফরেক্স ট্রেডিং নিয়ে দ্রুত নীতিমালা নয়
সংবাদ সম্মেলনে ফরেক্স কারেন্সি ট্রেডিং নিয়ে নীতিমালা করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে জাহেদ উর রহমান বলেন, এ মুহূর্তে খুব দ্রুত কোনো নীতিমালা করার পরিকল্পনা নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং তিনি নিজেও এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
এক সাংবাদিক বলেন, বাংলাদেশে শত শত ব্রোকার কোটি কোটি টাকা প্রতিদিন ফরেক্স ট্রেডিং করছে। লাভ-লোকসান হলেও সরকার এ খাত থেকে কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। এর উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, তিনি বিষয়টি বুঝতে পারছেন এবং এই বাস্তবতা মেনেই কোনো না কোনোভাবে বিষয়টিকে নীতিমালার মধ্যে আনার প্রয়োজন আছে।
তবে ফরেক্স কারেন্সি ট্রেডিং এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিকে এক করে না দেখার আহ্বান জানান জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর জন্য তৈরি হয়েছে। ফলে ক্রিপ্টো ট্রেডিংকে রাষ্ট্রের নীতিমালার অংশ করার বিষয়টি আলাদাভাবে দেখতে হবে।
তিনি বলেন, ফরেন কারেন্সি ট্রেডিং আরেক আলাদা জিনিস, সেটা হতে পারে, কিন্তু ক্রিপ্টো না। আমরা যেন এই দুটোকে একত্র করে না ফেলি।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন ক্রিপ্টো ট্রেডিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়, এক সাংবাদিকের এমন বক্তব্যের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, কোনো ফোনে ক্যামেরা বা অন্য কোনো সুবিধা রয়েছে দেখে সেটি কী কাজে ব্যবহার করা হয়, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত ফোন ক্রিপ্টো ট্রেডিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হয় এমন তথ্য যাচাইহীন। প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে এ ধরনের তথ্য বলা উচিত নয়।
ভিটামিন ডি সমৃদ্ধকরণ নিয়ে কাজ চলছে
তেলের মধ্যে ভিটামিন ডি ফোর্টিফিকেশন বা সমৃদ্ধকরণ নিয়ে জানতে চাইলে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি নিজেও বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা পারসু করার চেষ্টা করছি এবং আমি তাদের সঙ্গে কাজ করে চেষ্টা করব এটা যাতে দ্রুত করা যায়। এই ব্যাপারে সদিচ্ছা সরকারের আছে।
‘স্যার’ সম্বোধন নিয়ে মানসিকতা পরিবর্তনের আহ্বান
সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ‘স্যার’ না বললে কর্মকর্তাদের অসন্তুষ্ট হওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, কাউকে ‘স্যার’ বলায় সমস্যা নেই। যে কেউ যেকোনো মানুষকে ‘স্যার’ বলতে পারেন। কিন্তু এটিকে সেবা পাওয়ার শর্তে পরিণত করা অত্যন্ত ভয়ংকর।
তিনি বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঘোষণাই আছে যে সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বলা যাবে না। এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।তবে শুধু আইন বা নির্দেশনা দিয়ে এ ধরনের মানসিকতা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
জাহেদ উর রহমান বলেন, এই যে আলাপটা হচ্ছে, এই আলাপটা হোক, আস্তে আস্তে আমাদের মানসিকতা একটু পাল্টাক, আশা করি পাল্টাবে।
সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল
একটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিষয়টি তিনি ব্যক্তিগতভাবে খতিয়ে দেখবেন।
সরকারকে প্রশ্ন করার কারণে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে? এমন ধারণার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রশ্ন করার কারণে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না।
তিনি বলেন, সাংবাদিকরা প্রতিদিন সরকারকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রেও সরকারের সহনশীলতা রয়েছে।
তিনি জানান, ছয় মাসের একটি তথ্য অনুযায়ী ৪৬৪টি বড় ধরনের অপতথ্যের মধ্যে ১৫৭টির লক্ষ্যবস্তু ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে ওই সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড কেন বাতিল করা হয়েছে, তা তিনি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।
চীনের সঙ্গে চুক্তি হয়নি, আলোচনা চলছে
চীনের সঙ্গে চুক্তি হয়ে গেছে, আগের ব্রিফিংয়ে এমন বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল বলে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, তিনি চুক্তি হয়েছে বলেননি। তাকে জানানো হয়েছিল, চীনের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং বেশি দামে কেন হচ্ছে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।
তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে আলোচনা চলছে, এমন তথ্যই তাকে জানানো হয়েছিল।
মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার কর্মী বিনামূল্যে যাওয়ার তথ্য সঠিক
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, ১০ হাজার কর্মী বিনামূল্যে যাওয়ার যে তথ্য তিনি দিয়েছিলেন, সেটি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এবং সঠিক তথ্য।
তিনি বলেন, তার কাছে থাকা ব্রিফিংয়ের কাগজে মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া তথ্যই থাকে এবং তিনি সেগুলো পড়ে শোনান।
উপদেষ্টা বলেন, ১০ হাজারের সংখ্যাটা ঠিক আছে। তবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দুই লাখ ১০ হাজার কর্মী যাওয়ার যে সংখ্যা বলা হয়েছিল, মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে সেটি নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।
এমএএস/জেএইচ
