রাজশাহীতে ৪৫০ কোটি টাকার পাট বাণিজ্যের সম্ভাবনা
পাটের মাঠে এবার যেন সোনালি সম্ভাবনার ঢেউ। অনুকূল আবহাওয়া এবং বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়ায় রাজশাহীতে এবার পাটের ব্যাপক ফলন ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলায় চলতি মৌসুমে সাড়ে ৪ শত কোটি টাকার পাট বিক্রির আশা করছে কৃষি বিভাগ।
রাজশাহীর মোহনপুর, বাগমারা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, পবা, তানোর, গোদাগাড়ী, চারঘাট ও বাঘার বিস্তীর্ণ জমিতে বাম্পার ফলন হয়েছে পাটের। আর বাজারে মিলছে গত কয়েক বছরের তুলনায় স্বস্তিদায়ক দাম।
বর্ষাকালের পর্যাপ্ত বৃষ্টি এবার পাটচাষিদের জন্য বাড়তি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। পাশাপাশি জাগ দেওয়ার জন্যও মিলেছে প্রয়োজনীয় পানি। ফলে পাট কাটার পর আঁশ ছাড়ানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় গত কয়েক বছরের তুলনায় ভোগান্তি কমেছে কৃষকদের।
জেলার বিভিন্ন এলাকার মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও পাট কেটে আঁটি বাঁধছেন কৃষক, কোথাও পানিতে জাগ দেওয়া পাট থেকে আঁশ ছাড়ানো হচ্ছে। আবার কোথাও বাড়ির আঙিনায় ধোয়া পাট রোদে শুকিয়ে বাজারজাতের প্রস্তুতি চলছে। কৃষকের ব্যস্ততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জমে উঠছে স্থানীয় হাট-বাজারও।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহীর নয়টি উপজেলায় মোট ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ৪৯ হাজার টন। ইতোমধ্যে জেলার প্রায় ৮২ শতাংশ জমির পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ শেষ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৪৮ হাজার ২০০ টন পাট পাওয়া গেছে। বাকি জমির পাট সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষ হলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গত মৌসুমে রাজশাহীতে পাটের আবাদ হয়েছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ টন। এক বছরের ব্যবধানে এবার আবাদ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর। একই সঙ্গে উৎপাদনও গত বছরের তুলনায় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ফলনের এ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারদরের ইতিবাচক চিত্র। রাজশাহীর বিভিন্ন হাট-বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের পাটের ক্ষেত্রে দাম উঠছে ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে কৃষকের ঘরে যেমন বাড়ছে পাট বিক্রির টাকা, তেমনি গ্রামীণ হাট-বাজারেও বাড়ছে লেনদেন।
মোহনপুরের কেশরহাট পৌরসভার বিশালপুর গ্রামের পাটচাষি মো. সুজন ইসলাম বলেন, গত বছর পাটের ভালো দাম না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ছিল। এবার ফলন ভালো হওয়ার পাশাপাশি বাজারদরও ভালো রয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৬০০ টাকার বেশি দরে বিক্রি করতে পারছেন। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও এবার ভালো লাভ হবে বলে আশা করছেন তিনি।
ধুরইল ইউনিয়নের মহব্বতপুর গ্রামের কৃষক জয়নাল আলম দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তিনি বলেন, সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় এবার পাট জাগ দেওয়া ও ধোয়ার কাজে তেমন সমস্যা হয়নি। বাজারদরও ভালো থাকায় কৃষকরা খুশি।
মোহনপুরের এই স্বস্তির ছবি আরও স্পষ্ট বাগমারায়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এবার পাটের গাছ হয়েছে লম্বা ও স্বাস্থ্যবান। মাঠ থেকে পাট কেটে কৃষকরা জাগ দিচ্ছেন। ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়ায় অনেকেই আগামী মৌসুমে আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।
বাগমারা উপজেলার কৃষক হাফিজুর রহমান চার বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট চাষ করেছেন। তিনি বলেন, এবার গাছের বৃদ্ধি খুব ভালো হয়েছে। সময়মতো জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যও পেয়েছেন। ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি করেছেন তিনি। এতে আগের তুলনায় মণে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি পেয়েছেন। তাই আগামী বছর আরও বেশি জমিতে পাট চাষের পরিকল্পনা করছেন।
দুর্গাপুরে এবার পাটের মাঠে স্বস্তি থাকলেও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কিছুটা বাড়তি খরচের কথা বলছেন কৃষকরা। একই সময়ে ব্যাপক পরিমাণ পাট কাটা ও আঁশ ছাড়ানোর কারণে শ্রমিক সংকট তৈরি হয়েছে। এতে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি। লোডশেডিং ও সার সংকটও উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে। তবে বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত লাভের মুখ দেখছেন তারা।
দুর্গাপুরের কৃষক শাহীন আলম বলেন, এবার পাটের ফলন ভালো হয়েছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টির কারণে জাগ দেওয়ার পানিরও সমস্যা হয়নি। তবে একসঙ্গে সবাই পাট কাটা ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ শুরু করায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে এবং মজুরিও বেড়েছে। লোডশেডিং ও সার সংকটের কারণে উৎপাদন খরচও বেড়েছে। তারপরও ভালো দাম পাওয়ায় লাভ হয়েছে।
পুঠিয়া, চারঘাট ও বাঘার কৃষকদের মাঠেও একই চিত্র। অন্যদিকে তানোর, গোদাগাড়ী ও পবার অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতেও পাটের আবাদ হয়েছে। অনুকূল বৃষ্টি ও কৃষকদের পরিচর্যায় এসব এলাকার জমিতেও ফলন ভালো হয়েছে। ফলে জেলার প্রায় সব এলাকাতেই পাট নিয়ে কৃষকের প্রত্যাশা বেড়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মিতা সরকার বলেন, ‘সরকারি প্রণোদনা, সময়মতো উন্নতমানের বীজ ও সার সরবরাহ এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার রাজশাহীতে পাটের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরাও পাট চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা দরে হিসাব করলে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার পাট বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।’
পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক নাদিম আক্তার বলেন, ‘চলতি বছর জেলায় প্রায় ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল পাট উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন প্রায় ২১ হাজার কুইন্টাল বেশি হতে পারে। বর্তমানে কোনো কোনো এলাকায় প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, ‘বাংলাদেশ একসময় পাটের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে পাটের ব্যবহার ও গুরুত্ব কিছুটা কমে এসেছে। একসময় পাট দিয়ে নানা ধরনের পণ্য তৈরি ও ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে এর ব্যবহার অনেকটাই সীমিত। পাটের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে পাট আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাটজাত পণ্যের নতুন বাজার তৈরি, পাটের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া গেলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে।
মনির হোসেন মাহিন/কেজে/এএসএম

