গণশৌচাগারের অব্যবস্থাপনা, নারী ও শিশুর জন্য প্রতিকার কী?

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
জয়শ্রী দাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগে জরুরি কাজে গিয়েছিলাম। সেখানকার ওয়াশরুমে প্রবেশ করতে যাব, হঠাৎ একজন অপরিচিত নারী, মনে হলো শিক্ষক, আমাকে বললেন, ‘শিক্ষকদের ওয়াশরুমে আপনি কেন প্রবেশ করছেন? আপনি কে?’ বললাম, ‘পিএইচডির ছাত্রী।’ বেশ রুক্ষ গলায় তিনি বললেন, ‘আপনি কেন এই ওয়াশরুম ব্যব...

জয়শ্রী দাস

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগে জরুরি কাজে গিয়েছিলাম। সেখানকার ওয়াশরুমে প্রবেশ করতে যাব, হঠাৎ একজন অপরিচিত নারী, মনে হলো শিক্ষক, আমাকে বললেন, ‘শিক্ষকদের ওয়াশরুমে আপনি কেন প্রবেশ করছেন? আপনি কে?’ বললাম, ‘পিএইচডির ছাত্রী।’ বেশ রুক্ষ গলায় তিনি বললেন, ‘আপনি কেন এই ওয়াশরুম ব্যবহার করবেন? আপনি ছাত্র-ছাত্রীদের ওয়াশরুমে যান।’ ছাত্র-ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গিয়ে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। কারণ সেটি ছিল অত্যন্ত দুর্গন্ধময়। যত্রতত্র টিস্যু পড়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘদিন ধরে এই শৌচাগার পরিষ্কার করা হয়নি।

গণশৌচাগারের ক্ষেত্রগুলো

গণশৌচাগার বা পাবলিক টয়লেটের মধ্যে রয়েছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বাসস্ট্যান্ড, অফিস-আদালত, হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এসব জায়গায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ শৌচাগার ব্যবহার করেন। শৌচাগার বা টয়লেট নোংরা থাকলে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ, বদ্ধ ও আর্দ্র জায়গা জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

নোংরা শৌচাগার থেকে বিভিন্ন ধরনের রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যেমন- ডায়রিয়া হতে পারে ই-কোলাই ও সালমোনেলার মতো ব্যাকটেরিয়ার কারণে। আমাশয় বা ডিসেন্ট্রি হতে পারে শিগেলা ও জিয়ার্ডিয়ার সংক্রমণে। কলেরার জন্য দায়ী ভিব্রিও কলেরি এবং টাইফয়েডের জন্য দায়ী সালমোনেলা টাইফি। এ ছাড়া স্ক্যাবিস বা খোস-পাঁচড়া, দাদ বা রিংওয়ার্ম, ফোঁড়া ও ত্বকের বিভিন্ন সংক্রমণ হতে পারে। গোলকৃমি, ফিতাকৃমি ও জিয়ার্ডিয়ার মতো পরজীবীর সংক্রমণও নোংরা শৌচাগারের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

ভাইরাসজনিত রোগের মধ্যে হেপাটাইটিস এ এবং নোরোভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। নোরোভাইরাসের কারণে বমি ও ডায়রিয়া হতে পারে। এ ছাড়া ইউরিন ইনফেকশন বা ইউটিআই, চোখের কনজাংটিভাইটিস এবং দুর্গন্ধ ও ছত্রাকের কারণে শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

কেন জীবাণু দ্রুত ছড়ায়

নোংরা কমোড, ফ্লোর, দরজার হাতল, ট্যাপসহ বিভিন্ন জায়গায় জীবাণু লেগে থাকতে পারে। সেখান থেকে হাতে জীবাণু চলে আসে এবং পরে খাবার বা মুখের সংস্পর্শে গিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই শৌচাগার পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি ব্যবহারকারীকেও কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ব্লিচ বা উপযুক্ত জীবাণুনাশক দিয়ে নিয়মিত কমোড ও ফ্লোর পরিষ্কার করা প্রয়োজন। টয়লেট ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধোয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দরজার হাতল, ট্যাপ ও ফ্লাশ নিয়মিত জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। পাশাপাশি ওয়াশরুম শুকনো রাখা এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা জরুরি। পাবলিক টয়লেট তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ব্যবহার করেন এবং অনেক সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও ব্যবস্থা থাকে না।

পাবলিক টয়লেট ব্যবহারে সতর্কতা

পাবলিক টয়লেটে প্রবেশের আগে সঙ্গে টিস্যু ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখা ভালো। সিট কভার না থাকলে টিস্যু দিয়ে সিট ঢেকে নেওয়া যেতে পারে। সেটিও সম্ভব না হলে ফ্লাশ করার পর পানি দিয়ে পরিষ্কার করে টিস্যু দিয়ে মুছে নেওয়া যেতে পারে। ভেতরে কোনো কিছু সরাসরি হাত দিয়ে ধরার পরিবর্তে টিস্যু ব্যবহার করা ভালো। দরজা, ফ্লাশ বা ট্যাপ ধরার সময়ও টিস্যু ব্যবহার করা যেতে পারে। মেঝেতে পানি বা ময়লা থাকতে পারে, তাই পা দুটো যতটা সম্ভব দূরে রাখা উচিত।

টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধুতে হবে। শুধু পানি দিয়ে হাত ধোয়া যথেষ্ট নয়। হাত ধোয়ার পর টিস্যু ব্যবহার করে ট্যাপ বন্ধ করা যেতে পারে। সঙ্গে একটি ছোট হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখাও উপকারী। গবেষণায় পাবলিক টয়লেটের যেসব জায়গায় তুলনামূলক বেশি জীবাণু থাকতে পারে, তার মধ্যে ফ্লাশের বোতাম, দরজার হাতল, ট্যাপ ও সিট অন্যতম। তাই এসব জায়গায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

বাসস্ট্যান্ডের টয়লেট

বাসস্ট্যান্ডের টয়লেট আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এসব টয়লেট ব্যবহার করলেও অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা পানির ব্যবস্থা থাকে না। ফলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও কলেরার মতো পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। এ ছাড়া অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে হেপাটাইটিস এ ও টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়াতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে অপরিষ্কার সিট ও মেঝের কারণে ইউটিআই এবং ছত্রাকজনিত সংক্রমণের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। দেওয়াল বা বেঞ্চে বসার মাধ্যমেও স্ক্যাবিস ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।

হাসপাতালের টয়লেট

বছর কয়েক আগে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ওয়ার্ডের ওয়াশরুমে গিয়ে দেখি থইথই পানি, তার মধ্যে ময়লা-আবর্জনা ভেসে বেড়াচ্ছে। বেশ খানিকটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। হাসপাতালের টয়লেটের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। কারণ এখানে সুস্থ, অসুস্থ এবং বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীরা একই ধরনের ওয়াশরুম ব্যবহার করেন। ফলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অন্য অনেক জায়গার তুলনায় বেশি।

হাসপাতালের টয়লেট থেকে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী কিছু জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। যেমন- এমআরএসএ ত্বকের সংক্রমণ ঘটাতে পারে। সি. ডিফের কারণে তীব্র ডায়রিয়া ও পেটব্যথা হতে পারে। ক্লেবসিয়েলা ও সিউডোমোনাসের মতো জীবাণু নিউমোনিয়া ও ইউটিআইয়ের মতো সংক্রমণের কারণ হতে পারে। এ ছাড়া ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরা, নোরোভাইরাসজনিত বমি ও ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস এ ও বি, ছত্রাকজনিত সংক্রমণ, স্ক্যাবিস এবং ইউটিআইয়ের মতো সমস্যার ঝুঁকিও থাকে। বিশেষ করে ক্যাথেটার ব্যবহারকারী রোগীদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

হাসপাতালের টয়লেট বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি কম থাকায় অল্প পরিমাণ জীবাণুতেও তারা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। আবার ফ্লাশ করার সময় জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি হাসপাতালের টয়লেট ২৪ ঘণ্টা ব্যবহৃত হয়। ফলে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা না থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

হাসপাতালের টয়লেট ব্যবহারের নিরাপদ নিয়ম

হাসপাতালের টয়লেটে প্রবেশের আগে মাস্ক ও স্যান্ডেল ব্যবহার করা ভালো। সঙ্গে টিস্যু, স্যানিটাইজার ও প্রয়োজনীয় ওয়াইপস রাখা যেতে পারে। সম্ভব হলে কমোডের সিটে সরাসরি না বসে সতর্কভাবে ব্যবহার করা উচিত। বাধ্য হয়ে বসতে হলে কয়েক স্তর টিস্যু ব্যবহার করা যেতে পারে। ফ্লাশ করার সময় কমোডের ঢাকনা নামিয়ে দেওয়া ভালো। কারণ ফ্লাশের সময় জীবাণুযুক্ত কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

দরজা, ফ্লাশ ও ট্যাপ সরাসরি হাত দিয়ে না ধরে টিস্যু ব্যবহার করা ভালো। টয়লেট থেকে বের হওয়ার পর ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড সাবান ও পানি দিয়ে হাত ভালোভাবে ধুতে হবে। নখ, কনুই ও আঙুলের ফাঁকও পরিষ্কার করতে হবে। শুধু হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

রোগীদের জন্য বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। সম্ভব হলে রোগীর জন্য আলাদা টয়লেট ব্যবহার করা উচিত এবং কমন টয়লেট এড়িয়ে চলা ভালো। রোগী দুর্বল হলে সঙ্গে গিয়ে সহযোগিতা করতে হবে এবং পরে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। হাসপাতালে যাওয়ার উদ্দেশ্য সুস্থ হওয়া, সঙ্গে সংক্রমণ নিয়ে বাড়ি ফেরা নয়। তাই হাসপাতালের ওয়ার্ডের টয়লেটকে সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।

প্রস্রাব চেপে রাখার সমস্যা

অনেকেই অপরিষ্কার পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের ভয়ে প্রস্রাব চেপে রাখেন। এর পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে—ক্লাস বা অফিসে পর্যাপ্ত বিরতি না পাওয়া, মাসিকের সময় টয়লেটে যেতে অস্বস্তি বোধ করা, পর্যাপ্ত পানি বা নিরাপদ টয়লেটের অভাব ইত্যাদি। তাই দীর্ঘসময় প্রস্রাব চেপে রাখলে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআইয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মূত্রথলিতে দীর্ঘসময় প্রস্রাব জমে থাকলে ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তারের সুযোগ পেতে পারে। বারবার এমন হলে ব্লাডার ও মূত্রনালির বিভিন্ন সমস্যাও দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

মূত্রথলি ও অন্ত্র পাশাপাশি থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্য বা মূত্রথলি অতিরিক্ত পূর্ণ থাকলেও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের সময় দীর্ঘক্ষণ প্যাড বা ট্যাম্পন পরিবর্তন না করাও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অত্যন্ত দীর্ঘসময় ট্যাম্পন রেখে দিলে টক্সিক শক সিনড্রোমের মতো বিরল কিন্তু গুরুতর জটিলতাও হতে পারে।

নারীরা কেন প্রস্রাব চেপে রাখেন

পাবলিক টয়লেট নোংরা ও অপরিষ্কার হওয়া, স্কুল-কলেজ বা অফিসে পর্যাপ্ত বিরতি না পাওয়া, মাসিকের সময় টয়লেট ব্যবহারে অস্বস্তি এবং পর্যাপ্ত পানি বা নিরাপদ টয়লেটের অভাব—এসব কারণে অনেক নারী ও কিশোরী প্রস্রাব চেপে রাখেন। কিন্তু প্রস্রাব শরীরের একটি স্বাভাবিক সংকেত। শরীর যখন প্রস্রাবের প্রয়োজনের কথা জানায়; তখন সম্ভব হলে তা আটকে না রেখে টয়লেট ব্যবহার করা উচিত।

তিনটি গোল্ডেন রুল

সুস্থ থাকার জন্য তিনটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। প্রথমত, তিন থেকে চার ঘণ্টার বেশি প্রস্রাব চেপে রাখা উচিত নয়। শরীর যখন প্রস্রাবের সংকেত দেয়, তখন ‘পরে যাব’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। দ্বিতীয়ত, মাসিকের সময় বাড়তি যত্ন নিতে হবে। প্রতি তিন থেকে চার ঘণ্টা পর প্যাড বা ট্যাম্পন পরিবর্তন করা, নিয়মিত পরিষ্কার হওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করলে প্রস্রাবের মাধ্যমে মূত্রনালি পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে এবং কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে পারে।

তৃতীয়ত, টয়লেট ব্যবহারের সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সঙ্গে টিস্যু ও স্যানিটাইজার রাখা, প্রয়োজন হলে সিটে টিস্যু ব্যবহার করা এবং টয়লেট থেকে বের হওয়ার পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া উচিত। প্রস্রাব আসা শরীরের একটি স্বাভাবিক সংকেত। এটি চেপে রাখা মানে শরীরের প্রয়োজনকে অগ্রাহ্য করা। নোংরা টয়লেটের ভয়ে স্কুল-কলেজের শিশু, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা কর্মজীবী মানুষের দিনের পর দিন প্রস্রাব চেপে রাখা উচিত নয়। নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট নিশ্চিত করা তাই শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, জনস্বাস্থ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সমাধান কোথায়

একবার হাসপাতালের যন্ত্রপাতি তৈরির একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজের প্রয়োজনে গিয়েছিলাম। সেখানে এক কর্মকর্তা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলেছিলেন, তার মেয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। মেয়ের অসুস্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি দীর্ঘসময় প্রস্রাব চেপে রাখার কথা উল্লেখ করেছিলেন। শিশুদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। নোংরা বা অনিরাপদ টয়লেটের কারণে তারা প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও টয়লেট ব্যবহার করতে চায় না। দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ওয়াশরুম বা শৌচাগার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করায় অনেকেই হয়তো হাস্যরস করেছেন, নানা কথা বলেছেন। কিন্তু আমি মনে করি, এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আমরা ‘মনিটরিং’, ‘ব্যবস্থাপনা’ বা ‘পর্যবেক্ষণ’ ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত। একই ব্যবস্থাপনার আওতায় কয়েকটি ওয়াশরুম বা শৌচাগারের জন্য একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ করা যেতে পারে। তার দায়িত্ব হবে প্রতিবার একজন শিক্ষার্থী বা ব্যবহারকারী টয়লেট থেকে বের হওয়ার পর সেটি মুছে শুকনো রাখা। পাশাপাশি টয়লেটের কোনো অংশ ভেঙে গেলে দ্রুত মেরামত করাও তার দায়িত্বের মধ্যে থাকতে পারে।

এ জন্য পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি পর্যায়ে এ ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন। এর ফলে অনেক শিশু ও শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। একজন শিক্ষার্থী যদি সামান্য অতিরিক্ত ফি দিয়েও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বেতন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সেই ব্যবস্থা করা অসম্ভব নয়। কারণ যে কোনো পাবলিক টয়লেটের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতার বিকল্প নেই।

পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ শৌচাগার কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্য ও মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত একটি বিষয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বাসস্ট্যান্ড, অফিস, আদালত কিংবা হাসপাতাল—সব জায়গাতেই স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদেরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। একটি পরিচ্ছন্ন টয়লেট শুধু দুর্গন্ধমুক্ত পরিবেশ তৈরি করে না, বরং অসংখ্য মানুষকে বিভিন্ন সংক্রমণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই গণশৌচাগারের অব্যবস্থাপনা দূর করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও গবেষক।

এসইউ

Original Source
https://www.jagonews24.com/women-and-children/article/1157411
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in World