নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে চলবে দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন
দেশে প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এই ট্রেন চলবে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে। ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ রুটে এই বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর প্রকল্পে মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি ব্যয় ৯৪২ কোটি টাকা। বাকি টাকা উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে দেবে ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩০ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. সুবক্তগীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ইমপ্লিকেশন অব ইলেকট্রিক ট্রাকশন অ্যালং নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হচ্ছে। সামনের একনেক সভায় এটি উপস্থাপন করা হবে। ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। এসব এলাকার সড়কে যানজট ও গাড়ির চাপ কমাতে বৈদ্যুতিক রেলব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই রুটে যাত্রীও অনেক বেশি। প্রকল্পটি চালু হলে ঢাকার ওপর চাপও কমবে। অনেকে জয়দেবপুর-নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় সহজেই যাতায়াত করতে পারবেন।’
বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়, নানা কারণে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হচ্ছে। তার মধ্যে অন্যতম- বাংলাদেশ রেলওয়ের নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে ট্রেনের গড় গতিবেগ বৃদ্ধি, বাংলাদেশ রেলওয়ের নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে পরিচালন ব্যয় হ্রাস ও আয় বৃদ্ধি; কার্বন নিঃসরণ হ্রাস ও সবুজ পরিবহন ব্যবস্থা সৃষ্টি; নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে সড়ক পরিবহনের ওপরে চাপ কমানো; বাংলাদেশ রেলওয়ের নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে অপারেশনাল ইফিসিয়েন্সি বৃদ্ধি করা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে আরও জানায়, বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ার কারণে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। বর্তমানে পরিবহন খাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবা প্রদানের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় সরকারকে সড়ক অবকাঠামো খাতে অধিক বিনিয়োগ করতে হয়। রেলওয়ে বিদ্যুতায়ন করলে তার পরিবহন সক্ষমতা বাড়বে এবং সড়ক খাতে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, যেখানে যাত্রীচাপ, শিল্পাঞ্চলের উপস্থিতি এবং মোটরযানের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। বিদ্যমান সড়ক ও রেলপথ চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত। রেল নেটওয়ার্কের বিদ্যুতায়ন যাত্রার সময় কমাবে, প্রতি ট্রেনের বহন ক্ষমতা বাড়াবে এবং পরিবহন ব্যয় হ্রাস করবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পরিবহন খাতে কার্বন নিঃসরণ কমে জীবনমানের উন্নতি হবে। প্রকল্পের প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব ২০২৫ সালের ৩০ জুন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ নীতিগতভাবে অনুমোদন করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রস্তাবনার প্রেক্ষিতে এডিবি ও ইআইবি প্রকল্পটিতে অর্থায়নের বিষয়ে আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। তখন প্রস্তাবিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) ব্যয় ছিল ৪ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। তবে প্রস্তাবিত ডিপিপি হতে পুনর্গঠিত ডিপিপিতে মোট ৪৬০ কোটি ৩৫ (১২.০৪ শতাংশ) কোটি টাকা ব্যয় কমেছে।
প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি রেলপথ। প্রতিদিন কয়েক লাখ যাত্রী এ পথে চলাচল করেন। কিন্তু রেলপথ ও রোলিং স্টকের সীমাবদ্ধতার জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে চাহিদা অনুযায়ী পরিবহন সেবা দিতে পারছে না। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন বাস্তবায়িত হলে রেলপথের সেকশনাল ক্যাপাসিটি ও রোলিং স্টকের পরিবহন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে ডিজেল-ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন সিস্টেম ব্যবহার করে ট্রেন পরিচালনা করছে। এ সিস্টেমের তুলনায় ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন সিস্টেম প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয়ী। এছাড়া ডিজেল-ইলেকট্রিক রোলিং স্টকের তুলনায় ইলেকট্রিক রোলিং স্টকের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কম। তাই ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন সিস্টেমে ট্রেন পরিচালনা করা উল্লেখযোগ্যভাবে সাশ্রয়ী। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রেল পরিচালনার ক্ষেত্রে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন সিস্টেম ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশ রেলওয়েতে বর্তমানে প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন সিস্টেমের রোলিং স্টকের তুলনায় ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন সিস্টেমের রোলিং স্টকের এক্সিলারেশন ও ডিসিলারেশন বেশি। তাই ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ তুলনামূলকভাবে দ্রুত গতি বাড়াতে ও কমাতে পারে। সে কারণে ইলেকট্রিক ট্যাকশন সিস্টেমের রোলিং স্টকের গড় গতিবেগ তুলনামূলকভাবে প্রায় ১৮-২০ শতাংশ বেশি হয়। বিশ্বব্যাপী ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন সিস্টেম পরিবেশবান্ধব রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাই ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন সিস্টেম বাংলাদেশ রেলওয়েতে ব্যবহার করা হলে তা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অবদান রাখতে সক্ষম হবে। সার্বিক বিবেচনায় প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রস্তাবিত সেকশনে ট্রেনের গড় গতিবেগ বৃদ্ধি পাবে; পরিচালন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হ্রাস পাবে; পরিবহন সক্ষমতা ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাই প্রকল্পটি বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম
৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেম নির্মাণ; ১৬ সেট (প্রতি সেটে ৫ টি কোচ) ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) সংগ্রহ, ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) মেরামত কারখানা নির্মাণ।
প্রকল্প এলাকা নির্বাচনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় এখানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। বর্তমানে দেশের পরিবহন খাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মার্কেট শেয়ার কম। ফলে সড়ক ও মহাসড়কের উন্নয়ন, সম্প্রসারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে যদি পরিবহন খাতে তার মার্কেট শেয়ার বৃদ্ধি করতে পারে, তবে সরকার সড়ক পরিবহন খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যয় সাশ্রয় করতে পারবে।
তবে এক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমানে ব্যবহৃত ডিজেল লোকোমোটিভের স্বল্প প্রাপ্যতা অর্থাৎ মোট লোকোমোটিভের তুলনায় সচল লোকোমোটিভের সংখ্যা কম। বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা চালু করা হলে বাংলাদেশ রেলওয়ে তার পরিবহন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে পারবে।
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথ বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত রেল করিডোর। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক যাত্রী নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা এবং জয়দেবপুর থেকে ঢাকায় যাতায়াত করেন। কিন্তু এই রুটে বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থা চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত। বর্তমান সড়ক ও রেলপথের সক্ষমতা যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। বিদ্যমান রেলপথে ইলেকট্রিক ট্যাকশন বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের পরিবহন সময় হ্রাস পাবে, প্রতি ট্রেনের পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ে দ্রুততর, অধিক সাশ্রয়ী ও অধিক সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম হবে, যা সড়ক পরিবহনের ওপর বিদ্যমান চাপ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়তা করবে।
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর অঞ্চলটি বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর এলাকায় বিপুল সংখ্যক শিল্প-কারখানা অবস্থিত। এই প্রকল্প এলাকার সড়কে মোটরচালিত যানবাহনের ঘনত্বও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। শিল্প-কারখানা এবং সড়কে মোটরচালিত যানবাহনের ঘনত্বও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। শিল্প-কারখানা এবং মোটরচালিত যানবাহনের নির্গমণের কারণে এ অঞ্চলে বায়ুদূষণের মাত্রা অত্যন্ত উচ্চ এবং অনেক সময় এটি বিশ্বের সর্বাধিক দূষিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে স্থান পায়। এর ফলে এই অঞ্চলের জনগণের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর এই অঞ্চলে পরিবহন খাত থেকে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে বায়ুদূষণ কমবে এবং স্থানীয় জনগণের জীবনমানের উন্নতি ঘটবে। যেহেতু পরিবেশদূষণের কারণে এ অঞ্চলের জনগণ বাংলাদেশের মধ্যে সর্বাধিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তাই বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটটি নির্বাচন করা হয়েছে।

রাজস্ব আহরণে সব বিভাগকে তাগিদ রেলওয়ের
প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপনের যুক্তি তুলে ধরে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর বিদ্যমান রেলপথে ইলেকটিক ট্র্যাকশন স্থাপনের মাধ্যমে ট্রেনের পরিবহন সময় হ্রাস পাবে, প্রতি ট্রেনের পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবহন ব্যয় কম হবে।’
‘ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ে দ্রুততর, অধিক সাশ্রয়ী ও অধিক সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম হবে, যা সড়ক পরিবহনের ওপর বিদ্যমান চাপ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়তা করবে। এছাড়া, পরিবেশে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসসহ রেলের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।’ যোগ করেন তিনি।
এমওএস/ইএ





