কেমন ছিল খলিফা হারুন আল-রশিদের শাসনামল
হারুন আল-রশিদ ছিলেন আব্বাসীয় খিলাফতের পঞ্চম খলিফা। তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তিনি ১৭ মার্চ ৭৬৩ অথবা ফেব্রুয়ারি ৭৬৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২৪ মার্চ ৮০৯ সালে মারা যান। হারুন আল-রশিদ ৭৮৬ থেকে ৮০৯ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তাঁর শাসনকালকে ইসলামের স্বর্ণযুগের শীর্ষ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময়ে বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে ব্যাপক সমৃদ্ধি ঘটে। তাঁর শাসনামলে ইসলামি শিল্প ও সংগীতও উল্লেখযোগ্যভাবে বিকশিত হয়।
হারুন আল-রশিদের শাসনামলে ‘বায়তুল হিকমা’ বা জ্ঞানগৃহের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত এবং বিভিন্ন ধর্মের—যেমন খ্রিষ্টান, ইহুদি, মুসলিম ও জরথুস্ত্রবাদী—শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী জ্ঞানী, কবি, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদরা একত্রিত হতেন। সম্ভবত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর চার খলিফার পর আর কোনো মুসলিম শাসকই বিখ্যাত আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশিদের মতো এত ব্যাপক প্রশংসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারেননি।
শুরুর জীবন
হারুন বর্তমান ইরানের তেহরান প্রদেশের অন্তর্গত তৎকালীন জিবাল অঞ্চলের রে শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আব্বাসীয় খিলাফতের তৃতীয় খলিফা আল-মাহদির (৭৭৫-৭৮৫) ছেলে। তাঁর মা ছিলেন আল-খায়জুরান, ইয়েমেনের সাবেক দাসি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী। স্বামী, মা ও ছেলেদের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে তাঁর ব্যাপক প্রভাব ছিল। খলিফা হওয়ার আগে ৭৮০ ও ৭৮২ সালে হারুন আব্বাসীয় খিলাফতের ঐতিহ্যগত শত্রু পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে নামমাত্র নেতৃত্ব দেন। সে সময় সাম্রাজ্যটি সম্রাজ্ঞী এথেন্সের আইরিনের অধীনে ছিল। দ্বিতীয় অভিযানটি ছিল অত্যন্ত বড় পরিসরের এবং তা কনস্টান্টিনোপলের এশীয় উপকণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
খলিফা হিসেবে হারুন
৭৮৬ সালে বিশের কোঠার শুরুর দিকে হারুন খলিফা হন। তাঁর সিংহাসনে আরোহণের দিন তাঁর ছেলে আল-মামুন জন্মগ্রহণ করেন এবং কিছুদিন পর আল-আমিনের জন্ম হয়। আল-আমিন ছিলেন আল-মানসুরের নাতনি জুবাইদার সন্তান। ফলে তাঁর মা পারস্যের নারী হওয়ায় আল-মামুনের তুলনায় আল-আমিন উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পান। হারুন তাঁর শাসনামলের শুরুতেই অত্যন্ত দক্ষ কয়েকজন মন্ত্রী নিয়োগ করেন। তাঁরা দক্ষতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা করেন। ফলে জনগণের জীবনযাত্রার অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়। হারুন আল-রশিদের শাসনামলেই বাগদাদ তাঁর সময়ের অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ শহরে পরিণত হয়। অনেক শাসক খলিফাকে কর বা উপঢৌকন দিতেন। এসব অর্থ স্থাপত্য, শিল্পকলা এবং রাজদরবারের বিলাসী জীবনযাপনে ব্যয় করা হতো।
৭৯৬ সালে হারুন তাঁর রাজদরবার ও সরকার ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যাঞ্চলের রাক্কায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে তিনি তাঁর শাসনামলের ১২ বছর কাটান। এ সময়ে মাত্র একবার অল্প সময়ের জন্য বাগদাদে ফিরে যান। রাক্কায় রাজধানী স্থানান্তরের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। এটি বাইজেন্টাইন সীমান্তের কাছে ছিল। ইউফ্রেটিস নদীপথে বাগদাদ, বালিখ নদীপথে উত্তরের অঞ্চল এবং পালমিরা হয়ে দামেস্কের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ছিল উন্নত। নতুন সাম্রাজ্যিক কেন্দ্রের প্রয়োজন মেটাতে সেখানে কৃষিকাজও সমৃদ্ধ ছিল। রাক্কা থেকে সিরিয়া ও মধ্য ইউফ্রেটিস অঞ্চলের যে কোনো বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ ছিল।
আবু আল-ফারাজ আল-ইসফাহানি তাঁর কবিতার সংকলনে হারুনের দরবারের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের বর্ণনা দিয়েছেন। রাক্কায় বারমাকিদরা সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিচালনা করতেন। সেখানেই হারুনের দুই উত্তরাধিকারী আল-আমিন ও আল-মামুন বেড়ে ওঠেন। পুরো সাম্রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনার জন্য হারুন তাঁর পরামর্শদাতা ও দীর্ঘদিনের সহযোগী ইয়াহইয়া বিন খালিদ বিন বারমাকের ওপর নির্ভর করতেন। হারুন তাঁকে পূর্ণ নির্বাহী ক্ষমতাসহ উজির বা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। ১৭ বছর ধরে ইয়াহইয়া ও তাঁর ছেলেরা হারুনের বিশ্বস্ততার সঙ্গে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। হারুন ৭৯৩, ৭৯৫, ৭৯৭, ৮০২ ও সর্বশেষ ৮০৩ সালে কয়েকবার মক্কায় হজ পালন করেন। ঐতিহাসিক তাবারি তাঁর শাসনামলের বিবরণ শেষ করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, হারুন আল-রশিদ মারা যাওয়ার সময় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ৯০ কোটি বা তার কিছু বেশি দিরহাম ছিল।
উপদেষ্টা হিসেবে হারুন
৭৮৯ সালে তাঁর মা মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত সাম্রাজ্য পরিচালনায় হারুন তাঁর মায়ের ইচ্ছা ও প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তাঁর উজির বা প্রধানমন্ত্রী ইয়াহইয়া বারমাকি, ইয়াহইয়ার ছেলেরা—বিশেষ করে জাফর ইবনে ইয়াহইয়া এবং অন্যান্য বারমাকিরা সাধারণত প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতেন। আল-রশিদের শাসনামলে আব্বাসীয় খলিফার দরবারে পারসিকদের অবস্থান সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
বারমাকিদরা ছিল পারস্যের বালখ অঞ্চলের একটি পরিবার। তাদের বংশের ইতিহাস বারমাক নামে একজন বংশানুক্রমিক বৌদ্ধ পুরোহিত পর্যন্ত পৌঁছায়। বালখ বিজয়ের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আল-মাহদির আমলে অত্যন্ত ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। ইয়াহইয়া হারুনকে খিলাফত লাভে সহায়তা করেছিলেন। তিনি ও তাঁর ছেলেরা ৭৯৮ সাল পর্যন্ত হারুনের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। ওই বছর খলিফা তাঁদের কারাগারে পাঠান এবং তাঁদের জমিজমা বাজেয়াপ্ত করেন।
ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ইবনে জারির আল-তাবারি এই ঘটনা ৮০৩ সালে সংঘটিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এবং এর কারণ হিসেবে বিভিন্ন বিবরণ তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিল—অনুমতি ছাড়া ইয়াহইয়ার খলিফার সামনে প্রবেশ, মুহাম্মদ ইবনে আল-লাইথের বিরোধিতা এবং জাফরের এমন একজন ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া, যাকে হারুন কারাবন্দি করেছিলেন।
তবে বারমাকিদদের পতনের সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ ছিল এমন কিছু আচরণ, যা হারুন অসম্মানজনক মনে করেছিলেন। যেমন- অনুমতি ছাড়া তাঁর দরবারে প্রবেশ করা এবং খলিফার সঙ্গে পরামর্শ না করে রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ইয়াহইয়া বারমাকির পর আল-ফাদল ইবনে আল-রাবি হারুনের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

নবীবংশের ইলমরত্ন সাইয়্যেদা নাফিসা (রহ.)
হারুনের কূটনীতি
ঐতিহাসিক আইনহার্ড ও নটকার দ্য স্ট্যামারার হারুন ও শার্লেমানের দরবারের মধ্যে দূত বিনিময়ের কথা উল্লেখ করেছেন। খ্রিষ্টানদের পবিত্র ভূমিতে প্রবেশাধিকার এবং উপহার বিনিময় নিয়েও তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছিল। নটকারের বর্ণনা অনুযায়ী, শার্লেমান হারুনকে স্পেনের ঘোড়া, রঙিন ফ্রিসিয়ান চাদর ও শিকারি কুকুর পাঠিয়েছিলেন। ৮০২ সালে হারুন শার্লেমানকে উপহার হিসেবে রেশম, পিতলের মোমবাতিদান, সুগন্ধি, বালসাম, হাতির দাঁতের তৈরি দাবার ঘুঁটি, বিভিন্ন রঙের পর্দাযুক্ত বিশাল তাঁবু, আবুল-আব্বাস নামের একটি হাতি এবং একটি জলঘড়ি পাঠান।
জলঘড়িটি ব্রোঞ্জের বল একটি পাত্রে ফেলে ঘণ্টা নির্দেশ করত। একই সঙ্গে প্রতি ঘণ্টায় ছোট দরজা খুলে যান্ত্রিক অশ্বারোহী সৈন্য বেরিয়ে আসত এবং দরজা আবার বন্ধ হয়ে যেত। পশ্চিম ইউরোপে এসব উপহার ছিল নজিরবিহীন এবং এগুলো ক্যারোলিঞ্জীয় শিল্পকলায় প্রভাব ফেলতে পারে।
৮০২ সালে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্ঞী আইরিন ক্ষমতাচ্যুত হলে নাইকিফোরোস প্রথম সম্রাট হন। তিনি হারুনকে কর দিতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর যুক্তি ছিল, এতদিন আইরিনেরই কর পাওয়ার কথা ছিল। এতে হারুন ক্ষুব্ধ হন। তিনি রোমান সম্রাটের চিঠির পেছনে একটি বার্তা লিখে পাঠান। এশিয়া মাইনরে কয়েকটি সামরিক অভিযানের পর নাইকিফোরোসকে অপমানজনক শর্তে একটি চুক্তিতে সম্মত হতে হয়।
হারুন চীনের তাং রাজবংশের সঙ্গেও একটি জোট গড়ে তোলেন। তিনি চীনে দূত পাঠিয়েছিলেন। তাং রাজবংশের নথিতে তাঁকে ‘আ-লুন’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এই জোটের লক্ষ্য ছিল তিব্বতীয়দের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।
হারুন আল-রশিদের মৃত্যু
রাফি ইবনে আল-লাইথের নেতৃত্বে সামরকন্দে একটি বড় বিদ্রোহ শুরু হলে হারুন আল-রশিদকে খোরাসানে যেতে হয়। তিনি প্রথমে আলি বিন ইসা বিন মাহানকে পদচ্যুত ও গ্রেফতার করেন। কিন্তু বিদ্রোহ অব্যাহত থাকে। খোরাসানে পৌঁছানোর পর হারুন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তুসের কাছে সানাবাদ গ্রামে অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যান। তাঁকে খোরাসানের আব্বাসীয় গভর্নর হামিদ ইবনে কাহতাবার গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ দার আল-ইমারায় সমাহিত করা হয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে পরে দার আল-ইমারা ‘হারুনিয়্যাহর সমাধি’ নামে পরিচিত হয়। পরে ইমাম আল-রিদার শাহাদাতের কারণে ৮১৮ সালে স্থানটি ‘মাশহাদ’ বা ‘শাহাদাতের স্থান’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
উত্তরাধিকার
হারুন আল-রশিদ তাঁর সাম্রাজ্য মূলত দুই ছেলে আল-আমিন ও আল-মামুনের মধ্যে ভাগ করে দেন। পরে তৃতীয় ছেলে আল-কাসিমকেও উত্তরাধিকার তালিকায় যুক্ত করা হয়। খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সাম্রাজ্য ভাগ করে দিয়ে হারুন আসলে দুই পক্ষকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি তাদের এমন পর্যাপ্ত সম্পদ দিয়েছিলেন, যার ফলে তারা একে অপরের থেকে স্বাধীনভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। হারুন আল-রশিদের মৃত্যুর পর তাঁর দুই ছেলে আল-আমিন ও আল-মামুনের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ পুরো খিলাফতজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও সংঘাত সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত ৮২৭ সালে আল-মামুনের চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে এর অবসান ঘটে।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড, অ্যালকেট্রন।
এসইউ




