কাদেরসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড: সাত আসামির কার কী অপরাধ
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় কয়েকটি অভিযোগে আসামিদের আমৃত্যু কারাদণ্ড ও খালাসও দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের উসকানি, নির্দেশনা ও বিভিন্ন সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এর ফলে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকে মৃত্যুদণ্ড, আমৃত্যু কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগে দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের অধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ চালিয়ে হত্যা ও নির্যাতন করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, কাদেরের নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা, সম্পৃক্ততা ও জ্ঞাতসারে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মুঠোফোনে কথোপকথন হয়। আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দিয়ে কাদের তখন সাদ্দামকে বলেছিলেন, ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?’
অন্যদিকে ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা ও নাতিপুতি’ সম্বোধন করে বক্তব্য দেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন বলে অভিযোগে বলা হয়।
১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রুখে দিতে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কাদের বলেন, ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ।’ রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেন এবং হত্যার নির্দেশনা দেন।
কাদেরের বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। এতে নারীসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী এবং সারাদেশে অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
১৬ জুলাই তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে ফোন করে ইন্টারনেটের গতি ধীর করার নির্দেশ দেন কাদের। একই দিনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে ফোন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ চট্টগ্রাম মহানগরের সব এলাকা দখলে রাখার নির্দেশ দেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এর পর চট্টগ্রামের চাঁন্দগাঁও থানাধীন মুরাদপুর এলাকায় গুলি করে মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও মো. ফারুককে হত্যা করা হয়। একই দিনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ সারাদেশে ছয়জন আন্দোলনকারী নিহত হন বলে অভিযোগে বলা হয়।
১৭ জুলাই তেজগাঁওয়ের দলীয় কার্যালয়ে ঢাকা জেলা ও ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগ এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিজ নিজ এলাকায় আন্দোলন দমনে প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন কাদের।
১৮ জুলাই ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ও ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী-সমর্থকদের রাজপথে নেমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন তিনি।
১৯ জুলাই গণভবনে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতাদের বৈঠক শেষে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রসঙ্গে কাদের বলেন, ‘এটা অবশ্যই কারফিউ, সেটা শুট অ্যাট সাইট হবে।’ রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, এর মাধ্যমে তিনি দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধ / আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগ তিন সংগঠনেরই সভাপতি-সেক্রেটারির ফাঁসির আদেশ
এ ছাড়া শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের ষড়যন্ত্র, অপহরণ, গুম, হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয় ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়, ১৮ জুলাই মিরপুরে শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনসহ তিনজন, ১৯ জুলাই আসিফ ইকবালসহ ৩০ জন এবং ২০ জুলাই সিফাত হোসেনসহ বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।
৩ আগস্ট ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলন রুখে দিতে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন কাদের।
এর পর ৪ আগস্ট মিরপুরে শাহরিয়ার হাসান আলভী, মিরাজ ফরাজি, মহিউদ্দিনসহ ১২ জন, ফেনীর মহিপালে ইশতিয়াক আহমেদসহ সাতজন এবং লক্ষ্মীপুর সদরে সাদ-আল আফনানসহ চারজনকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
৫ আগস্ট মিরপুরে মাহফুজুল আলমসহ ২০ জন এবং রাজশাহী মহানগরে রায়হান আলী ও সাকিব আনজুমসহ সারাদেশে অসংখ্য আন্দোলনকারী নিহত হন বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় সারাদেশে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০ এর বেশি নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুরুতর আহত করা হয়।
বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, তার অধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডারদের মাধ্যমে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর হামলা, হত্যা ও নির্যাতনের অপরাধ সংঘটিত হয়।
১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
বাহাউদ্দিন নাছিমের প্ররোচনার পর চট্টগ্রামে মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহমেদ ও মো. ফারুককে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ। একই দিনে আবু সাঈদসহ সারাদেশে ছয়জন নিহত হন।
নিজ জেলা মাদারীপুরে আন্দোলন দমনে সাবেক মেয়র খালিদ হোসেনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারকির অভিযোগও রয়েছে নাছিমের বিরুদ্ধে। সেখানে ১৮ জুলাই দীপ্ত দে এবং ১৯ জুলাই তৌহিদকে হত্যা এবং অসংখ্য আন্দোলনকারীকে আহত করার অভিযোগ করা হয়।
৪ আগস্ট বাংলামোটরে আবদুল গনি, বেলাল হোসেন ও নয়ন মিয়া এবং পল্টন নাইটিঙ্গেল মোড়ে ওবায়দুল হককে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগে বলা হয়। ৫ আগস্ট ঢাকা মেডিকেলের সামনে রাকিব হোসেন, গুলিস্তানে রমজান মিয়া, বাংলামোটরে ইসমাইল হোসেন ও চাঁনখারপুলে ইমামুল হকসহ মোট ১৩ জন নিহত হন বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ।
মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
অভিযোগে বলা হয়, ১৩ জুলাই তেজগাঁওয়ের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে কোটা আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই—এমন বক্তব্যসহ বিভিন্ন উসকানিমূলক ও ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য দেন তিনি।
১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশ করে উসকানিমূলক বক্তব্য এবং পরিকল্পিতভাবে হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা হামলা চালায়।
১৯ জুলাই প্রেস ব্রিফিংয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন আরাফাত। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাঁচ বছর অস্ত্র-গুলি ব্যবহার করার মতো মজুত রয়েছে—এমন বক্তব্য দিয়ে হুমকি দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
মহাখালী রেলক্রসিং ও চৌরাস্তা এলাকায় ১৯ জুলাই ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সার্বিক তত্ত্বাবধানের অভিযোগও আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া ২০ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ফোনালাপে টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে কথা বলার অভিযোগ রয়েছে।
আন্দোলন দমনে সরকারের বলপ্রয়োগ ও সহিংসতার সংবাদ প্রচার করায় কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও করা হয় আরাফাতের বিরুদ্ধে।
শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে অভিযোগ
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ ফজলে শামস পরশ। অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর আক্রমণে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি ছাত্র-জনতা নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, এসব হত্যা ও নির্যাতনের অন্যতম নির্দেশদাতা ও নেতা ছিলেন পরশ।
১৮ জুলাই যুবলীগ ক্যাডারদের গুলিতে চট্টগ্রাম মহানগরে তানভীর ছিদ্দিকী, সায়মন মাহিন ও হৃদয় চন্দ্র তরুয়াকে হত্যা এবং ১৯ জুলাই মহাখালী এলাকায় শাহাজাহান, গণি মিয়া, আল আমিন রনি, জাহিদ হোসেন, ইমাম মেহেদী হাসান ও মামুন হোসেনকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে এক বক্তব্যে পরশ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে ‘আগ্রাসন ও ধ্বংসলীলা’ বলে আখ্যায়িত করেন। এ সময় জামায়াত নিষিদ্ধের পর আন্দোলনকারীরা ‘মরণ কামড়’ দিতে পারে বলে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগে বলা হয়।
৪ আগস্ট লক্ষ্মীপুর শহরে যুবলীগ ক্যাডারদের গুলিতে সাদ-আল আফনান, ওসমান পাটোয়ারী, সাব্বির হোসেন ও কাওসার এবং ৫ আগস্ট রাজশাহী মহানগরে আলী রায়হান ও সাকিব আঞ্জুম নিহত হন বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ।
মাইনুল হোসেন খান নিখিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ
যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, ১২ জুলাই সিলেট সিটি করপোরেশনের একটি অনুষ্ঠানে আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ করে আন্দোলন প্রতিহত করতে যুবলীগের নেতাকর্মী ও অনুসারীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
১৯ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ ও প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিখিল নিজে অস্ত্র হাতে মিরপুর এলাকায় মহড়া দেন এবং আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণসহ হামলা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
সেদিন বিকেলে তার নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় মিরপুরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয় বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ।
এ ছাড়া তার উপস্থিতি ও তত্ত্বাবধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যুবলীগসহ অন্যান্য অঙ্গ-সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা ৪ আগস্ট মিরপুরে শাহরিয়ার হাসানসহ ১২ জন এবং ৫ আগস্ট মাহফুজুল আলমসহ ২০ জনকে হত্যা করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দামের বিরুদ্ধে অভিযোগ
২০২ ৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন সাদ্দাম হোসেন।
অভিযোগে বলা হয়, ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে ছাত্রলীগের এক জমায়েতে আন্দোলনকারীদের ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ বলে হুমকি ও উসকানি দেন তিনি।
ওবায়দুল কাদেরের ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন’ নির্দেশনা বাস্তবায়নে সারা দেশে ছাত্রলীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীদের প্ররোচনা ও নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে সাদ্দামের বিরুদ্ধে।
১৫ জুলাই তার নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ এবং ঢাকা কলেজের নেতাকর্মীরা সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে।
‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’—ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যের পর সাদ্দাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মহানগর, জেলা ও উপজেলায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন ও তা তদারক করেন বলে অভিযোগে বলা হয়।
১৬ জুলাই আন্দোলনকারীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে সাদ্দামের বিরুদ্ধে। এরপর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ।
শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে অভিযোগ
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে অভিযোগ বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে তিনি বিভিন্ন পরিকল্পনা করেন, নির্দেশনা দেন এবং অর্থ গ্রহণ করেন।
১৩ জুলাই মধুর ক্যানটিনে হিংসাত্মক, বিদ্বেষপূর্ণ ও উসকানিমূলক বক্তব্য এবং আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার জন্য আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার নির্দেশ দেন ইনান। তার নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ এবং ঢাকা কলেজের নেতাকর্মীরা হামলা চালান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সাদ্দাম হোসেন আন্দোলনকারীদের দেখে নেওয়ার যে হুমকি দেন, সেখানে উপস্থিত থেকে ইনান তা সমর্থন করেন বলে অভিযোগ করা হয়। ওই দিন সারাদেশে ছয়জন নিহত হন।
১৮ জুলাই ছাত্রলীগসহ অন্যদের হামলায় সারাদেশে ২৩ জন নিহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে ইনানের প্ররোচনা, নির্দেশ ও তদারকিতে ছাত্রলীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা সারাদেশে হামলা চালান। এসব কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারী আহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড
এদিকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এই রায় ঘোষণা করা হয়।
এফএইচ/এমএমকে






