ম্যানগ্রোভ বন ঘেঁষে রেস্তোরাঁ নির্মাণ, হুমকিতে গঙ্গামতির জীববৈচিত্র্য
কুয়াকাটার গঙ্গামতি লেকের পাশে সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ঘেঁষে কাঠের স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। ধুলাসার ইউনিয়নের ধোলাই মার্কেটের পশ্চিম পাশে গত চার দিন ধরে প্রকাশ্যে চলা এ নির্মাণকাজে সংরক্ষিত বন, প্রাকৃতিক জলাশয় ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ও পরিবেশকর্মীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গঙ্গামতি লেক ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের একেবারে পাশে কাঠের স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি কাঠের খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। চলছে পাটাতন তৈরির কাজও। স্থাপনাটির আশপাশেই রয়েছে কেওড়া, গেওয়া, সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ ও অন্যান্য সংরক্ষিত গাছপালা। এসব গাছ উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, মাটির ক্ষয় রোধ এবং বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, বনাঞ্চল ও জলাশয়ের এত কাছাকাছি স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ তৈরি হলে ভবিষ্যতে সেখানে আরও স্থাপনা গড়ে উঠতে পারে। এতে ধীরে ধীরে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের পরিসর কমে যাওয়ার পাশাপাশি গাছপালা, পাখি, জলজ প্রাণী ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘স্থাপনা নির্মাণের প্রথম দিনই সেখানে উপস্থিত হয়ে কাজে বাধা দিয়েছি। তবে তারা নিজেদের জমি দাবি করে কাজ করছে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা ভূমি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকায় স্থাপনা নির্মাণে বন বিভাগ বা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র রয়েছে কি না এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।’
স্থানীয়দের অনেকেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। কে বা কারা স্থাপনাটি নির্মাণ করছেন এবং কী উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হচ্ছে এ বিষয়ে স্থানীয়ভাবে কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলতে চাননি। তবে স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন রয়েছে, কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মিলে স্থাপনাটি নির্মাণ করছেন।

পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, কুয়াকাটা সৈকতের লেম্বুরবন-খাজুরা থেকে গঙ্গামতি হয়ে কাউয়ার চর পর্যন্ত বেড়িবাঁধের বাইরে পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। এ নির্দেশনা উপেক্ষা করে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের পাশে স্থাপনা নির্মাণ করা হলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব শুধু বনাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, উপকূলীয় পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পরিবেশ সংগঠক নজরুল ইসলাম বলেন, গঙ্গামতির সংরক্ষিত বনাঞ্চল একটি পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকা। সংরক্ষিত বা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের মধ্যে প্রাকৃতিক জলাশয় ও লেকের আশপাশে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হলে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে বনাঞ্চল ধ্বংসের শঙ্কা তৈরি হবে। কুয়াকাটা সৈকত এলাকা রক্ষায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
‘আমি এই জমির রেকর্ড মালিক। প্রায় ১৫ বছর আগে জমিটি কিনেছি। বিএস রেকর্ডেও আমি মালিক। স্থানীয় এসিল্যান্ডের কাছে জমিটি মেপে দেওয়ার জন্য আবেদন করেছি। এখানে আমি রিসোর্ট করবো না, রেস্টুরেন্ট বানাবো।’
স্থানীয় জেলে ইদ্রিস ফরাজি বলেন, আমরা সাধারণ জেলে। সাগরে মাছ শিকার করে সংসার চালাই এবং এই বনের আশপাশে দিনরাত কাটাই। এভাবে স্থাপনা নির্মাণ শুরু হলে একে একে আরও অনেকে স্থাপনা গড়ে করবে। একসময় বন ধ্বংস হয়ে যাবে। এতে উপকূলের মানুষ ঝুঁকিতে পড়বে এবং আমাদের জেলে পেশাও হুমকির মুখে পড়বে। আমরা শুনছি এখানে নাকি রিসোর্ট এবং পার্ক করা হবে।

বড়দেশীতে অপরাধের শেকড় কোথায়
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কলাপাড়া উপজেলা কো-অর্ডিনেটর মেজবাহ উদ্দিন মাননু বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকায় জমির মালিকানা থাকলেও ইচ্ছেমতো স্থাপনা নির্মাণ করা যায় না। পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের ছাড়পত্র নিয়ে এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনে কাজ করতে হবে। সেখানে রিসোর্ট করার সুযোগ নেই। এ ধরনের স্থাপনা হলে স্থানীয় জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। বন্যা ও খরার সময় সাধারণ মানুষ আরও হুমকির মুখে পড়বে। পাশাপাশি উপকূলের জেলেদের আশ্রয়স্থলও সংকুচিত হয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীদের মতে, গঙ্গামতির সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বন ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের পাশে একটি স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি বা দৃষ্টান্ত তৈরি হলে ভবিষ্যতে একই এলাকায় আরও স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে কেওড়া, গেওয়াসহ সংরক্ষিত গাছপালা ও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন পরিবেশও হুমকির মুখে পড়বে।
‘গঙ্গামতির সংরক্ষিত বনাঞ্চল একটি পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকা। সংরক্ষিত বা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের মধ্যে প্রাকৃতিক জলাশয় ও লেকের আশপাশে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হলে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে বনাঞ্চল ধ্বংসের শঙ্কা তৈরি হবে। কুয়াকাটা সৈকত এলাকা রক্ষায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।’
তবে স্থাপনা নির্মাণকারী মো. মোস্তাকুর রহমান জমিটির মালিকানা দাবি করে জাগো নিউজকে বলেন, আমি এই জমির রেকর্ড মালিক। প্রায় ১৫ বছর আগে জমিটি কিনেছি। বিএস রেকর্ডেও আমি মালিক। স্থানীয় এসিল্যান্ডের কাছে জমিটি মেপে দেওয়ার জন্য আবেদন করেছি। এখানে আমি রিসোর্ট করবো না, রেস্টুরেন্ট বানাবো।
বন বিভাগের গঙ্গামতি বিট কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, স্থাপনা নির্মাণের প্রথম দিনই সেখানে উপস্থিত হয়ে কাজে বাধা দিয়েছি। তবে তারা নিজেদের জমি দাবি করে কাজ করছে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা ভূমি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকায় স্থাপনা নির্মাণে বন বিভাগ বা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র রয়েছে কি না এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক বলেন, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এনএইচআর


.jpg?branch=production&width=2400&quality=75&auto=webp&crop=16:9)
