জিন্নাহর ছবি নয়, ছবির নিচে বক্তব্যে প্রতিবাদের ইতিহাস না থাকায় আপত্তি

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতির চক্রান্তের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। সংগঠনটির অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় ইতিহাসকে একপেশেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংগ্রহশালা থেকে সরানো ঐতিহাসিক ছবি ও ...

বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতির চক্রান্তের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

সংগঠনটির অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় ইতিহাসকে একপেশেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংগ্রহশালা থেকে সরানো ঐতিহাসিক ছবি ও স্মারক পুনর্বহাল এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হল, জগন্নাথ হল ও বুয়েট সংলগ্ন ফুলার রোডের স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য চত্বরে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

এর আগে সংগঠনের নেতাকর্মীরা স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য চত্বরে থাকা ভাস্কর্যগুলোর চোখ-মুখে কালো ফিতা বেঁধে প্রতিবাদ জানান। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব ভাস্কর্য সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ভাস্কর্যগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে শোক ও ক্ষোভ জানাতেই এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

এসময় ছাত্র ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়া বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি বহনকারী ভাস্কর্যগুলোর এমন অবস্থা হয়েছে যে এগুলোর চোখ-মুখে কালো কাপড় দিয়ে প্রতিবাদ জানানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

তিনি বলেন, এসব ভাস্কর্য মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে। অথচ দীর্ঘদিনেও এগুলোর যথাযথ সংস্কার করা হয়নি।

পরে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ছাত্র ফেডারেশন অভিযোগ করে, ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চের ভাষণকে ‘A Historic Speech by Mohammad Ali Jinnah’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওই বক্তব্যে জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছিলেন।

সংগঠনটির দাবি, জিন্নাহর ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। কিন্তু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর বক্তব্যের ছবি রাখা হলেও সেই বক্তব্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের কোনো ছবি, সংবাদপত্রের কাটিং বা সংশ্লিষ্ট আর্কাইভ রাখা হয়নি।

ছাত্র ফেডারেশনের ভাষ্য, জিন্নাহর ছবি রাখা তাদের আপত্তির বিষয় নয়; বরং তার বিতর্কিত বক্তব্যের পাশাপাশি ওই বক্তব্যের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক প্রতিবাদ ও গণপ্রতিরোধের ইতিহাস অনুপস্থিত থাকাই তাদের আপত্তির জায়গা।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়া বলেন, জিন্নাহর ছবি রাখায় আমাদের সমস্যা নেই। সমস্যা হচ্ছে, জিন্নাহর বক্তব্যের পাশে সেই বক্তব্যের প্রতিবাদের ইতিহাস নেই।

তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ কিংবা জিন্নাহর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হতে পারে। তবে জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেটি ইতিহাসের একটি অংশ এবং সেই বক্তব্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী আবদুল মতিনসহ শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অর্ক বড়ুয়া বলেন, যে মুহূর্তে জিন্নাহ সেই বক্তব্য দিয়েছিলেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুল মতিন, যাকে আমরা ভাষা মতিন হিসেবে চিনি, প্রতিবাদ করেছিলেন। দেশের মানুষও পরে রাস্তায় নেমে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। সেই প্রতিরোধই আমাদের গৌরবের ইতিহাস।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যখন আপনি ঘৃণিত ইতিহাসের পাশে গৌরবের গণপ্রতিরোধের আর্কাইভ রাখবেন না, তখন আমরা কী বুঝব? আপনি কী প্রমাণ করতে চাইছেন, আমাদের কী শিক্ষা দিতে চাইছেন?

ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি সরিয়ে সেখানে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের অপমানের ছবি লাগানোর ঘটনাকে অনেকে ‘মব’ হিসেবে অভিহিত করছেন—এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানান অর্ক বড়ুয়া।

তিনি বলেন, যারা এটাকে মব বলছেন, তাদের প্রতি আহ্বান—মবের সংজ্ঞাটা একটু জেনে নিন। আমরা কেউ অনির্দিষ্ট বা অজ্ঞাত পরিচয়ের মানুষ নই। আমাদের নাম আছে, সংগঠন আছে এবং সংগঠনের নিজস্ব অবস্থান আছে। আমরা যা করেছি, তা বুঝে-শুনেই করেছি এবং এর দায় নিতেও আমরা প্রস্তুত।

তিনি আরও বলেন, এটা মব নয়; এটা গণপ্রতিরোধের ধারাবাহিকতা। যখন নিজেদের ইতিহাস ও জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব প্রশাসনের, কিন্তু প্রশাসন সেই দায়িত্ব পালন করছে না, তখন নিজেদের অস্তিত্ব ও ইতিহাস রক্ষার জন্য আমরা প্রতিবাদ করেছি।

তবে ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের সংঘাত বা অস্থিতিশীলতা তারা চান না বলেও জানান তিনি।

অর্ক বড়ুয়া বলেন, ’৪৭ কিংবা ’৭১-এর মতো প্রায় নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া বিষয়গুলোকে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে এনে ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা আমরা চাই না। বরং আমরা মনে করি, ইতিহাসকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করাই প্রয়োজন।

ডাকসু সংগ্রহশালায় একপেশে ইতিহাস উপস্থাপনের অভিযোগ তুলে অর্ক বড়ুয়া বলেন, ডাকসু সংগ্রহশালা নতুন কোনো বিষয় নয়। সেখানে এর আগে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও নথি ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষার্থী এবং স্বাধীনতাবিরোধী সহযোগীদের বিষয়ে বিভিন্ন রেকর্ডও সেখানে সংরক্ষিত ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

তার অভিযোগ, এসব গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও নথি সরিয়ে ফেলা হলেও কেন সরানো হয়েছে, সে বিষয়ে যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, সাংবাদিকরা যখন জিজ্ঞেস করেছেন, কেন এগুলো সরানো হলো, তখন বলা হয়েছে—ইচ্ছা হয়েছে, তাই সরানো হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা হলেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল সরিয়ে ফেলা যায় না।

তিনি আরও বলেন, ডাকসু সভাপতি পদাধিকারবলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলেও ডাকসু কোনো দলীয় প্রতিষ্ঠান, দলীয় সংগঠন বা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার জায়গা হতে পারে না।

পাঁচ দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়।

দাবিগুলো হলো—
১. ডাকসু সংগ্রহশালায় অনুমোদনহীন পরিবর্তন ও ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

২. ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে সরানো সব ছবি, নথি ও স্মারকের তালিকা প্রকাশ করতে হবে এবং অপসারিত ঐতিহাসিক ছবি ও স্মারক পুনর্বহাল করতে হবে।

৩. মহান বিজয় দিবসের আগে স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য চত্বর সংস্কার করতে হবে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত ভাস্কর্যগুলো পুনর্নির্মাণ করতে হবে।

৪. ক্যাম্পাসে থাকা সব ঐতিহাসিক স্থাপনা সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

৫. দেশজুড়ে সংঘটিত দখল ও ভাঙচুরের ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার উপকরণ হতে পারে না। ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়ের পাশাপাশি মানুষের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও গণআন্দোলনের ইতিহাসও সমান গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।

আরটি/এমকেআর

Original Source
https://www.jagonews24.com/education/news/1157564
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Education