মোদী কি ট্রাম্পকে সরিয়ে শি জিনপিং-পুতিনের হাত ধরেছেন?
দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ছে। ট্রাম্প বিভিন্ন সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ‘বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করলেও সাম্প্রতিক নানা পদক্ষেপে দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের মধ্যেই চীন, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি। বিশেষ করে ব্রিকস সম্মেলনকে ঘিরে মোদীর সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের একাধিক যোগাযোগ ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
তাহলে কি ট্রাম্পকে দূরে সরিয়ে পুতিন-শি জিনপিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন মোদী? নাকি ভারত তার পুরোনো ‘ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি’ই ধরে রাখছে?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কেন দূরত্ব বাড়ছে?
ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ ভারতীয়দের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অবৈধ ভারতীয় অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো।
অবৈধ ভারতীয়দের ফেরত পাঠানোর সময় তাদের হাতে হ্যান্ডকাফ পরানোর ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর ভারতে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিষয়টি মোদী সরকারের জন্যও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

এরপর ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপও দুই দেশের সম্পর্কে চাপ বাড়ায়। রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর তুলনামূলক বেশি শুল্ক আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। নয়াদিল্লি অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যেও রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে।
আরও পড়ুন>
রাশিয়া-চীন জোট আরও শক্তিশালী, ‘দুর্বল’ যুক্তরাষ্ট্র কী করবে?
মোদী-শি জিনপিং বৈঠক: সীমান্ত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গুরুত্ব
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধেও মতবিরোধ
ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সংঘাত থামাতে ট্রাম্প মধ্যস্থতার দাবি করেছেন। পাকিস্তান শুরু থেকেই বলে আসছে, ট্রাম্পের মধ্যস্থতার কারণেই যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে।
তবে ভারত এই দাবি স্বীকার করেনি। ট্রাম্প নিজেও একাধিকবার যুদ্ধ বন্ধে নিজের ভূমিকার কথা বলেছেন। এ বিষয়টি মোদী ও ট্রাম্পের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকলেও সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নানা পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে।
দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের সফর, সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু এবং বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সাত বছর পর ভারতে সফরে এসেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে তার সঙ্গে বৈঠক করেন মোদী।
সীমান্ত বিরোধ মেটাতে একসঙ্গে কাজ করবে ভারত-চীন
মোদী-শি বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুই নেতা সীমান্ত বিরোধের একটি ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন।
মোদী সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সীমান্তসংক্রান্ত বিদ্যমান চুক্তি ও সমঝোতা মেনে চলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
দুই দেশ সাংস্কৃতিক, ব্যবসায়িক ও পরিবহন যোগাযোগ আরও বাড়ানোর বিষয়েও একমত হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি, সরবরাহব্যবস্থা এবং দুই দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
শি জিনপিং বলেন, দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তারা একে অপরের শক্তি থেকে শিখতে এবং পরস্পরকে সহযোগিতা করতে পারে। তার মতে, চীন-ভারত সম্পর্ককে কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত।
রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ সত্ত্বেও ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কিনেছে। এতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ব্রিকস সম্মেলনেও মোদীর সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যোগাযোগ ছিল উল্লেখযোগ্য। পুতিন বলেন, ব্রিকস একটি নতুন ও আরও ন্যায্য বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে।

ইরানের সঙ্গেও বাড়ছে যোগাযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ সংঘাত ও যুদ্ধের মধ্যেও তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছে ভারত।
ব্রিকস বিজনেস ফোরামে মোদীকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের হাত ধরে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করতে দেখা যায়। দুই নেতার হাসিমুখে হাত ধরে হাঁটার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।
এই ছবি ভারত-ইরান সম্পর্কের পাশাপাশি ভারতের বৃহত্তর কূটনৈতিক অবস্থানকেও তুলে ধরে। কারণ একদিকে ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে ভারত, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে।
ব্রিকসে মোদীর বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের বার্তা
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে মোদী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আরও বেশি সহযোগিতার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ব্রিকসের শক্তি হলো এর বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা।
মোদী আরও বলেন, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য হিসেবে রাখলেই হবে না; বিশ্ব পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন>
রাশিয়া-চীন জোট আরও শক্তিশালী, ‘দুর্বল’ যুক্তরাষ্ট্র কী করবে?
মোদী-শি জিনপিং বৈঠক: সীমান্ত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গুরুত্ব
তার মতে, এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে প্রতিটি দেশের কথা বলার সুযোগ থাকবে এবং প্রতিটি সদস্যের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
জাতিসংঘ সংস্কারের রোডম্যাপের প্রস্তাব
বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের জন্য পরবর্তী ব্রিকস সম্মেলনের আগেই একটি রোডম্যাপ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন মোদী। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

তাহলে কি ট্রাম্পকে ছেড়ে দিচ্ছেন মোদী?
চীন, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ দেখে এমন প্রশ্ন উঠলেও বিষয়টি সরাসরি ‘যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে চীন-রাশিয়ার দিকে যাওয়া’ হিসেবে দেখার সুযোগ এখনই নেই।
ভারত চীন, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ কোনো একটি পক্ষের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলই অনুসরণ করছে নয়াদিল্লি।
বিশ্ব রাজনীতিতে যখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ইরানকে ঘিরে বিভাজন বাড়ছে, তখন ভারতের লক্ষ্য হতে পারে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করে সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা।
সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, এনডিটিভি
এমএসএম


