ফাটল ধরা বাঁধের পাহারায় গ্রামবাসী, ৩ দিনেও দেখা নেই প্রশাসনের
ঝুড়িভর্তি মাটি, হাতে কোদাল। রাত জেগে নদীর পাড়ে পাহারা। সাতক্ষীরার তালা উপজেলার খেশরা ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের মানুষের গত তিন দিন কাটছে এভাবেই।
কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধে নতুন করে ফাটল দেখা দেওয়ায় জোয়ারের পানির চাপে যেকোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় আতংকে রয়েছেন বালিয়া, শুভংকরকাঠি, তেঘরিয়া ও শ্রীমন্তকাঠি গ্রামের হাজারও মানুষ।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাতে জোয়ারের পানির তীব্র চাপে বালিয়া গ্রামের বেড়িবাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। বিলের মৎস্যঘেরের মালিকরা প্রথমে বিষয়টি টের পেয়ে দ্রুত গ্রামে এসে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেন। খবর পেয়ে ঘুম থেকে উঠে নারী-পুরুষসহ গ্রামের মানুষ ঝুড়ি ও কোদাল নিয়ে ছুটে যান নদের পাড়ে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তারা ভাঙা অংশটি সাময়িকভাবে মেরামত করে লোকালয়ে পানি প্রবেশ ঠেকান। সেদিন বড় ধরনের বিপদ এড়ানো গেলেও ঝুঁকি কাটেনি।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, বাঁধের আরও দুটি স্থানে নতুন করে ফাটল ধরেছে। ফাটল দিয়ে পানি চুইয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। গত তিনদিন ধরে গ্রামের মানুষ পালা করে বাঁধ পাহারা দিচ্ছেন এবং দুর্বল স্থানগুলো মাটি দিয়ে শক্ত করার চেষ্টা করছেন। তবে পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে এভাবে কতক্ষণ বাঁধ রক্ষা করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা।
বালিয়া গ্রামের বাসিন্দা নাজমিন আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘শনিবার রাতে সময়মতো সবাই ছুটে না গেলে এতক্ষণে ঘরবাড়ি ও মাছের ঘের লোনা পানিতে তলিয়ে যেত।’
তিনি বলেন, নতুন করে ফাটল ধরার পর গত তিনদিন ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফোন করা হলেও কেউ এসে পরিস্থিতি দেখেননি।
নাজমিন আক্তারের আশঙ্কা, বাঁধটি ভেঙে গেলে বালিয়াসহ পাশের শুভংকরকাঠি, তেঘরিয়া ও শ্রীমন্তকাঠি গ্রামের শতাধিক বাড়িঘর প্লাবিত হবে। একই সঙ্গে তলিয়ে যাবে বিস্তীর্ণ মাছের ঘের ও কৃষিজমি। এতে ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বালিয়া গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান গাজী ও জামাল উদ্দিন জানান, প্রায় ১২-১৩ বছর আগে কপোতাক্ষ নদ খনন শুরু হলে এলাকাবাসী সিএস ম্যাপ অনুযায়ী নদ খননের দাবি জানিয়েছিলেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রথম দুদিন সিএস ম্যাপ অনুযায়ী কাজ করলেও পরে সেই অনুযায়ী খনন বন্ধ হয়ে যায়।
তাদের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে ভিন্নভাবে খনন করায় কপোতাক্ষ নদ তার নিজস্ব গতিপথ থেকে সরে বালিয়া গ্রামের জনবসতির কাছাকাছি চলে আসে। এতে বালিয়া অংশে নদের গভীরতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একই সময়ে এলাকায় টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ায় নদ আরও খরস্রোতা হয়ে ওঠে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড এখানে কোনো স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করেনি। ফলে প্রায় প্রতিবছর জোয়ারের পানির চাপে টিআরএম সংযোগ খালের পাশে দুটি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে কৃষক ও ঘেরমালিকদের বড় অংকের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
তাদের অভিযোগ, স্থায়ী সমাধানের দাবিতে বারবার লিখিত আবেদন, সভা ও মানববন্ধন করা হলেও এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
খেশরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম লাল্টু বলেন, ‘বালিয়া গ্রামের বাঁধের একাধিক স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এবং নতুন করে ফাটল দেখা দিয়েছে। বাঁধ ভেঙে গেলে পুরো এলাকা লোনা পানিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তিনি জানান, বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। তবে এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করতে হবে। পাশাপাশি কপোতাক্ষ নদের বালিয়া অংশ সিএস ম্যাপ অনুযায়ী পুনরায় খনন করে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, বালিয়া এলাকার বাঁধের ঝুঁকির বিষয়টি তিনি জানেন। এর আগেও সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
তিনি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুরোধে সেখানে গিয়ে প্রাথমিকভাবে কাজের অনুমতি পাওয়া গেলেও পরে তা বাতিল করা হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বর্তমানে সারাদেশে জরুরি কাজ বন্ধ থাকায় আপাতত সেখানে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। মন্ত্রণালয় থেকে পুনরায় বরাদ্দ পাওয়া গেলে বাঁধের কাজ করা সম্ভব হবে।
আহসানুর রহমান রাজীব/এসআর/জেআইএম




