সামনে স্কুল পরীক্ষা, অথচ অভিষেকেই ইতিহাস গড়লেন ১৮ বছরের বাসন
বয়স মাত্র ১৮। এখনো স্কুলের শেষ পরীক্ষাই দেওয়া হয়নি। অথচ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকেই এমন কীর্তি গড়েছেন জেজে বাসন, যা দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকার ৪ দিনের প্রথম শ্রেণির ম্যাচে লায়ন্সের হয়ে অভিষেক ম্যাচে ৯৯ রানে ১১ উইকেট নিয়ে লাল বলের ক্রিকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে অভিষেক করা কোনো পেসারের সেরা ম্যাচ বোলিং ফিগার এখন তার দখলে।
এমন অভিষেক জেজে বাসন নিজেও কল্পনা করেননি। চলতি সপ্তাহেই তার স্কুলের শেষ পরীক্ষা দেওয়ার কথা। তার আগেই ক্রিকেট মাঠে নিজের নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে এ বছরের শুরুর দিকে দলের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন বাসন। তবে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে উঠে এসে অভিষেকেই যে এমন ঝড় তুলবেন, তা হয়তো খুব কম মানুষই ভেবেছিলেন।
‘আমার অভিষেক ম্যাচটা এমন হবে, কখনো কল্পনাই করিনি। যেভাবে অবদান রাখতে পেরেছি, সেটা দারুণ ব্যাপার। আমি যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে সত্যিই গর্বিত। এই ম্যাচটা অনেক দিন মনে থাকবে।’
বাসনের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ লায়ন্সের বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ড। দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক তারকা পেসার নিজের ক্যারিয়ারে অসংখ্য প্রতিভাবান ফাস্ট বোলার দেখেছেন। তাই নতুন কারও সম্ভাবনা নিয়ে খুব দ্রুত মন্তব্য করতে সাধারণত সতর্ক থাকেন তিনি। কিন্তু বাসনের অভিষেক তাকে এতটাই মুগ্ধ করেছে যে প্রশংসা না করে পারেননি।
‘এই ছেলেটাকে কী দারুণ খুঁজে পাওয়া গেছে!’- বলেছেন ডোনাল্ড। এরপরই অবশ্য সতর্ক করে দিয়েছেন, এত দ্রুত কোনো তরুণকে বড় কোনো তকমা দেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু বাসনের বোলিংয়ের পরিপক্বতা তাকে অবাক করেছে।
ডোনাল্ডের ভাষায়, ২৮ বছর বয়সী অনেক পেসার জীবনে হয়তো মাত্র একবার এমন স্পেল করতে পারেন, যা বাসন অভিষেকেই করে দেখিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে তার বোলিংয়ের পরিণত ভাব।
অভিজ্ঞ পেসারদের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব বাসনের কাঁধে
বাসনের কীর্তিকে আরও বিশেষ করে তুলেছে লায়ন্সের পরিস্থিতি। দলের নিয়মিত বেশ কয়েকজন পেসার তখন ছিলেন না। লুথো সিপামলা নামিবিয়ার বিপক্ষে চোটে পড়েছিলেন। কুয়েনা মাফাকা ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় দলের সঙ্গে। জেরাল্ড কোয়েৎজি ও কোডি ইউসুফ ছিলেন ‘এ’ দলের দায়িত্বে। আর ব্যক্তিগত কারণে ছিলেন না উইয়ান মুল্ডার।
ফলে অভিষেকেই লায়ন্সের বোলিং আক্রমণের নেতৃত্ব দিতে হয় বাসনকে। তার সঙ্গে ছিলেন আরও দুই বোলারের, উইলকো ডি ব্রুইন ও রাফিক প্যাটেলের, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক।
অর্থাৎ একেবারে নতুন একটি পেস আক্রমণের সামনে দায়িত্বটা ছিল বড়। কিন্তু প্রথম স্পেল থেকেই উইকেট নিয়ে বাসন বুঝিয়ে দেন, সেই দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি প্রস্তুত।
প্রথম ইনিংসে নিজের তৃতীয় ওভারেই বোল্যান্ডের ওপেনার ব্লেড ক্যাপেলকে বোল্ড করেন বাসন। সেটিই ছিল শুরু। এরপর তার শিকার হন গ্যাভিন কাপলান। আগের মৌসুমে ৯০০-এর বেশি রান করে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়া কাপলানকে প্রথম বলেই ফিরিয়ে দেন বাসন।
এরপর আউট করেন অপর ওপেনার রুয়ান টেরব্লাঞ্চেকে। তবে সবচেয়ে উপভোগ করেছেন দুইবারের টেস্ট অধিনায়ক নিল ব্র্যান্ডের উইকেটটি। ব্র্যান্ডকে সরাসরি বোল্ড করে দেন বাসন।
‘ওটাই আমার সবচেয়ে পছন্দের উইকেট। আমি তাকে পরিষ্কার বোল্ড করেছি। একজন বোলারের জন্য ব্যাটারের ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে বল গিয়ে স্টাম্প উড়িয়ে দেওয়া- এর চেয়ে বিশেষ কিছু হতে পারে না। এটাই আমার প্রিয় উইকেট।’
এক পর্যায়ে বোল্যান্ডের স্কোর দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ৯০ রান। সেই ছয়টি উইকেটই নিয়েছিলেন বাসন। এরপর আবার তাকে আক্রমণে ফিরিয়ে আনা হয় সেঞ্চুরিয়ান লেহান বোথাকে ফেরাতে। ১৭০ রান করা বোথাকেও শেষ পর্যন্ত নিজের শিকারে পরিণত করেন এই তরুণ পেসার। প্রথম ইনিংসে বাসনের বোলিং ফিগার দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ৬২ রান।
লায়ন্স পরে বোল্যান্ডের সামনে ২৭৯ রানের লক্ষ্য দেয়। চতুর্থ দিনে সেই লক্ষ্য রক্ষা করতে গিয়ে লায়ন্সের ভরসার জায়গা ছিলেন বাসনই। দলের অন্য যে কোনো পেসারের চেয়ে বেশি ওভার করেন তিনি এবং যে চারটি উইকেট পড়ে, সব কটিই তুলে নেন বাসন। অর্থাৎ অভিষেক ম্যাচে দুই ইনিংস মিলিয়ে ১১ উইকেট- ৯৯ রানে।
জেজে বাসনের বোলিংয়ে ডোনাল্ড সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ তার ছন্দ, সুইং ও কবজির অবস্থান দেখে। ‘ও যখন দ্বিতীয় স্পেল শুরু করল, তখনই বুঝতে পারছিলাম তার ছন্দ ঠিক জায়গায় আছে। এটা নিয়ে সে অনেক কাজ করেছে। আগে তার কিছু নো-বলের সমস্যা ছিল, কিন্তু এখন সে সেটা ঠিক করে ফেলেছে।’
তরুণ এই পেসারের বল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সুইং করার ক্ষমতাকেও বড় সম্পদ হিসেবে দেখছেন ডোনাল্ড। লম্বা গড়নের বাসনের স্বাভাবিক কবজির অবস্থান এবং বাঁহাতি হওয়াও তাকে বাড়তি সুবিধা দেয় বলে মনে করেন তিনি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ- শেখার আগ্রহ।
ডোনাল্ড বলেন, ‘বাসন খুব ভালো শ্রোতা এবং ভালো প্রশ্ন করে। অর্থাৎ শুধু প্রতিভা নয়, নিজের বোলিং আরও উন্নত করার মানসিকতাও রয়েছে তার।’
বাসনের পারফরম্যান্স দেখে ডোনাল্ডের মনে পড়ে গেছে কাগিসো রাবাদার কথা। ‘অ্যাডিলেড ওভালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কাগিসোর রাবাদাকে প্রথমবার দেখার সময়ও এমন অনুভূতি হয়েছিল। তখনই বুঝেছিলাম, ছেলেটার মধ্যে কিছু একটা আছে। মাঝেমধ্যে এমন কিছু ছেলে আসে, যাদের খুঁজে পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের- তাদের যত্ন করে গড়ে তুলতে হয়।’
অবশ্য বাসনের সঙ্গে রাবাদার তুলনা এখনই করার সময় আসেনি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন একজন তরুণ পেসারের আবির্ভাব দলটির জন্য নিঃসন্দেহে বড় সুখবর।
এই মৌসুমে দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরের মাঠে রয়েছে আটটি টেস্ট, নয়টি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি। এর বাইরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অ্যাওয়ে সিরিজে দুটি টেস্টও খেলবে তারা। এমন ব্যস্ত সূচিতে পেসারদের ওয়ার্কলোড ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই নিয়মিত পেসারদের বিশ্রাম ও রোটেশনের প্রয়োজন হতে পারে। সেই সুযোগে বাসনের জন্য জাতীয় দলের দরজাও হয়তো খুলে যেতে পারে। তবে আপাতত তার সামনে আরও জরুরি একটি কাজ- স্কুলের পড়াশোনা শেষ করা। ডোনাল্ডও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ‘পড়াশোনাই আগে।’
অভিষেক ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে বই নিয়ে বাসনের বসে থাকার দৃশ্যটিও তার কাছে বেশ মজার। সতীর্থদের ক্রিকেটের ব্যস্ততার মাঝেই বাসনকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। কারণ চলতি সপ্তাহেই তার শেষ পরীক্ষা।
এই কারণে লায়ন্সের পরের ম্যাচেও খেলছেন না তিনি। ব্লুমফন্টেইনে নাইটসের বিপক্ষে দলের সঙ্গে ভ্রমণ করার সুযোগ না পেয়ে কিছুটা হতাশ বাসন। ‘সম্ভবত সফরকারী একাদশের অংশ হওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া হওয়ায় খারাপ লাগছে। তবে এটা যাত্রারই অংশ।’
তবে স্কুল শেষ হওয়ার পর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাসনের কোনো দ্বিধা নেই, ‘আমার শেষ পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরোপুরি ক্রিকেট।’
আইএইচএস/
