উৎপাদন আংশিক বন্ধ ৭৮ শতাংশ কারখানায়, ক্রয়াদেশ কমেছে ৫৫ শতাংশের
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের নিটওয়্যার পোশাক খাতের ৭৮ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন আংশিক বন্ধ। নিটিং, ডায়িং ও গার্মেন্টস সেলাইয়ের উৎপাদন কমেছে ৩৭ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত। একই সময়ে রপ্তানি আদেশ বাতিল বা কমেছে ৫৫ শতাংশ কারখানার।
দেশের নিটওয়্যার পোশাক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) এক জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে।
তবে পোশাক মালিকদের আরেক সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বলছে, জ্বালানি সংকটের কারণে রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে- এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই। সংগঠনটি জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটে উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে। এতে কর্মঘণ্টা বাড়ছে, অর্ডার লেট শিপমেন্ট হচ্ছে ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি খরচে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা পুরো স্ট্যান্ডার্ড মেনে ওই জরিপ করেছি। বিকেএমইএর সক্রিয় সদস্য কারখানার প্রায় ২০ শতাংশের তথ্যের ভিত্তিতে জরিপটি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, নিটওয়্যার পোশাক উৎপাদন আংশিক বন্ধ থেকেছে প্রায় ৭৮ শতাংশ কারখানায়। আর রপ্তানি আদেশ বাতিল বা কমেছে প্রায় ৫৫ শতাংশ কারখানার।’
উৎপাদন কমেছে ৩৭ থেকে ৫১ শতাংশ
বিকেএমইএর জরিপ অনুযায়ী, গ্যাসের চাপের তথ্য দেওয়া কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহে গড়ে প্রায় ৭৮ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। লোডশেডিংয়ের তথ্য দেওয়া কারখানাগুলোতে আগের তুলনায় দৈনিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় গড়ে প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় প্রায় তিনগুণ হয়েছে।
জরিপে দেখা যায়, নিটিং উৎপাদন গড়ে ৩৭ থেকে ৩৮ শতাংশ কমেছে। ডায়িং উৎপাদন কমেছে গড়ে ৫১ শতাংশ ও গার্মেন্টস সেলাইয়ের উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানাকে বিকল্প জ্বালানির অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়েছে। একই হারে কারখানায় শ্রমঘণ্টা বা কর্মঘণ্টার অপচয় হয়েছে। প্রায় ৮৯ শতাংশ কারখানা ক্রেতার আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে ও শিপমেন্টে বিলম্ব হয়েছে ৮৭ শতাংশের।
এছাড়া প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানাকে ক্রেতাকে মূল্যছাড় দিতে হয়েছে। ব্যাংক ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে প্রায় ৫৯ শতাংশ। উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ৭ শতাংশ কারখানায়।

রাত ১২টা বাজার অপেক্ষায় থাকেন গৃহিণীরা
বিকেএমইএর জরিপের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, প্রায় সব উত্তরদাতাই বিদ্যুৎ ও গ্যাস- দুই সংকটের মুখে পড়েছেন। উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশ থেকে প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমেছে। এতে শিপমেন্টে বিলম্ব, ক্রেতার আস্থা হারানোর ঝুঁকি ও অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ বেড়েছে।
‘অর্ডার বাতিলের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘জ্বালানির কারণে অর্ডার বাতিল হয়েছে- এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি, জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছি। এতে আমাদের কর্মঘণ্টা বাড়াতে হচ্ছে। আমাদের সদস্যদের অর্ডার লেট শিফট হচ্ছে, কারও কারও এয়ার ফ্রেইট করতে হচ্ছে। তবে অর্ডার বাতিল হয়েছে- এমন কোনো তথ্য আমরা এখনো পাইনি। বিষয়টি আমরা জরিপ করে দেখছি।’
গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর আজ গ্যাসের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। চট্টগ্রামে আজ কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। তবে ঢাকায় গ্যাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও তিন দিন সময় লাগতে পারে। কারণ আপস্ট্রিম থেকে গ্যাস ছাড়ার পর পুরো ঢাকায় পৌঁছাতে তিন-চারদিন সময় লাগে।-বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান
তিনি বলেন, ‘গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর আজ গ্যাসের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। চট্টগ্রামে আজ কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। তবে ঢাকায় গ্যাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও তিনদিন সময় লাগতে পারে। কারণ আপস্ট্রিম থেকে গ্যাস ছাড়ার পর পুরো ঢাকায় পৌঁছাতে তিন-চারদিন সময় লাগে।’

বাড়তি আমদানিতেও সিলিন্ডার গ্যাসে সংকট
বিকেএমইএর এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, জরিপটি কিছুদিন আগে করা হলেও এতে উঠে আসা চিত্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের প্রকৃত পরিস্থিতিই তুলে ধরেছে। তবে সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠকে সংকট উত্তরণের আশ্বাস পাওয়ার পর তারা এখন পরিস্থিতির উন্নতির অপেক্ষায়।
‘অপেক্ষা করছি, কবে বাস্তব সমাধান হবে’
পোশাক রপ্তানিকারক স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শোভন ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের এখনো তেমন কোনো উন্নতি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দেখা হয়েছে। সেখানে আমাদের ডেকে নিয়ে সংকট সমাধানে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত বাস্তবে তেমন কোনো উন্নতি আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’
আমি এখন স্প্যারোতে আমার কারখানায় আছি। আজও তিনবার বিদ্যুৎ চলে গেছে। দুই ঘণ্টা, এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে। কিছুটা উন্নতি হয়তো আছে, কিন্তু সেটা খুব বেশি নয়।-স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এমডি শোভন ইসলাম
তিনি বলেন, ‘আমি এখন স্প্যারোতে আমার কারখানায় আছি। আজও তিনবার বিদ্যুৎ চলে গেছে। দুই ঘণ্টা, এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে। কিছুটা উন্নতি হয়তো আছে, কিন্তু সেটা খুব বেশি নয়।’
শোভন ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যখন আশ্বাস দিয়েছেন, আমরা আশা করছি পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এখন আমরা অপেক্ষা করছি, সময় গুনছি- কবে এই সংকটের বাস্তব সমাধান হবে।’
‘পোশাক খাত বড় চ্যালেঞ্জে’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘সব মিলিয়ে পোশাক খাত এখন একটি বিরাট চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে। বিশেষ করে কম্পোজিট ইউনিটগুলো গ্যাসের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। আর শুধু গার্মেন্টস কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেশি। সেখানে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করেও উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

গ্যাস সংকটে শিল্প-কারখানায় উৎপাদনে ধস
উৎপাদন কমার পেছনে শুধু জ্বালানি সংকটই নয়, অর্ডার কমে আসার বিষয়টিও রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আবার জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সেই বাড়তি ব্যয়ও সামাল দিতে পারছে না। সব মিলিয়ে পোশাক খাত বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে।’
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে আমরা চরম সমস্যার মধ্যে আছি। এখনো অনেক ফ্যাক্টরিতে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্য। কোনোভাবেই জেনারেটর বা বার্নার চালাতে পারছি না। বাধ্য হয়ে ডিজেল কিনে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।-বিএফপিআইএ সভাপতি সাফিউস সামি আলমগীর
বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফপিআইএ) সভাপতি ও টাম্পাকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফিউস সামি আলমগীর বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে আমরা চরম সমস্যার মধ্যে আছি। এখনো অনেক ফ্যাক্টরিতে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্য। কোনোভাবেই জেনারেটর বা বার্নার চালাতে পারছি না। বাধ্য হয়ে ডিজেল কিনে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুৎ অর্থাৎ জ্বালানি হচ্ছে যে কোনো উৎপাদন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি। বর্তমানে জ্বালানির সংকট চরম। যদিও গত দুই-এক দিনে জানতে পারছি, সরকার গ্যাসের সংকট দূর করতে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এলএনজি স্থানান্তরের কারিগরি ত্রুটিগুলো ঠিক করা হচ্ছে, ফলে সংকট কমতে পারে।’
এটা শুধু নিটওয়্যার বা বিকেএমইএর বিষয় নয়। দেশের ছোট, বড় ও মাঝারি শিল্প থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রয়োজন- সবকিছুই জ্বালানি সরবরাহের ব্যাঘাতে প্রভাবিত হয়েছে। যেহেতু জ্বালানি যে কোনো কলকারখানার প্রাণশক্তি, তাই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের সচেতন থাকা উচিত।-সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ
তিনি বলেন, ‘এটা শুধু নিটওয়্যার বা বিকেএমইএর বিষয় নয়। দেশের ছোট, বড় ও মাঝারি শিল্প থেকে শুরু করে গৃহস্থালির প্রয়োজন- সবকিছুই জ্বালানি সরবরাহের ব্যাঘাতে প্রভাবিত হয়েছে। যেহেতু জ্বালানি যে কোনো কলকারখানার প্রাণশক্তি, তাই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের সচেতন থাকা উচিত।’
নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পাশাপাশি আমাদের সক্ষমতার বিষয়টিও দেখতে হবে। অনেক জায়গায় অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু সরবরাহের ব্যবস্থা সব জায়গায় ঠিক নেই। গ্যাস ও বিদ্যুৎ- দুই ক্ষেত্রেই বিষয়টি দেখতে হবে। গ্যাস সীমিত সম্পদ হওয়ায় নিজেদের সম্পদের পাশাপাশি আমদানির ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।’
শিল্প-কারখানার প্রবৃদ্ধি অনুযায়ী নিয়মিত জ্বালানির চাহিদা মূল্যায়ন করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সেই অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ পরিকল্পনা থাকতে হবে। শুধু সাম্প্রতিক সরবরাহের ব্যাঘাত নয়, দীর্ঘদিন ধরেই চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ঘাটতি রয়েছে। তাই ছোট, মাঝারি ও বড়- সব শিল্পের কথা বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত।’
ইএইচটি/এএসএ/



