রেনশর সেঞ্চুরি পর এলিসের পাঁচ উইকেট- জিম্বাবুয়েকে হারালো অস্ট্রেলিয়া
দক্ষিণ আফ্রিকা অঞ্চলের সফরটা জয় দিয়েই শুরু করল অস্ট্রেলিয়া। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ম্যাট রেনশ ও নাথান এলিসের নৈপুণ্যে স্বাগতিকদের ৫৯ রানে হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া।
হারারেতে আগে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ২৯৪ রান সংগ্রহ করে অস্ট্রেলিয়া। ওয়ানডেতে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নেওয়া রেনশর করেন ১০৯ রান। তাকে দারুণভাবে সঙ্গ দেন কুপার কনোলি, করেন ৫১ রান। জবাবে নাথান এলিসের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে ৪৬ ওভারে ২৩৫ রানে গুটিয়ে যায় জিম্বাবুয়ে। এলিস ৩১ রানে নেন ৫ উইকেট।
তবে ম্যাচে শুধু অস্ট্রেলিয়ার দুই ক্রিকেটারই মাইলফলক ছুঁয়েছেন এমন নয়। জিম্বাবুয়ের ২০ বছর বয়সী বাঁ-হাতি পেসার নিউম্যান নিয়ামহুরিও ক্যারিয়ারসেরা ৫ উইকেট নিয়েছেন। ৬২ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়ে তিনি গড়েছেন দেশটির হয়ে নতুন রেকর্ড। মাত্র ২০ বছর ২৩৯ দিন বয়সে ওয়ানডেতে পাঁচ উইকেট নেওয়া সবচেয়ে কম বয়সী জিম্বাবুইয়ান বোলার এখন তিনিই।
একই ম্যাচে ইতিহাস গড়েছেন জিম্বাবুয়ের অভিজ্ঞ ব্যাটার ব্রেন্ডন টেলরও। ৪০ বছর বয়সী টেলর মাঠে নামার মাধ্যমে ওয়ানডে ক্রিকেটে সবচেয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের মালিক হয়েছেন। তার ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি দাঁড়িয়েছে ২২ বছর ১৪৮ দিন। এর মাধ্যমে তিনি পেছনে ফেলেছেন ভারতের কিংবদন্তি শচিন টেন্ডুলকারকে।
টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া। শুরুটা অবশ্য ভালো হয়নি সফরকারীদের। দ্বিতীয় ওভারেই ট্রাভিস হেডকে ফেরান ব্র্যাড ইভান্স। নিজের স্ট্যাম্পে বল টেনে এনে আউট হন হেড। এটি ছিল ওয়ানডেতে তার টানা চতুর্থ ‘ড্র্যাগ-অন’ আউট।
১০ রানে প্রথম উইকেট হারানোর পর মিচেল মার্শ ও কুপার কনলি দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নেন। ইভান্স ও ব্লেসিং মুজারাবানি শুরুতে কিছুটা বাড়তি শর্ট বা ওয়াইড বল করায় সুযোগ নেন দুই ব্যাটার। প্রথম আট ওভারেই দুজন মিলে আটটি চার ও একটি ছক্কা মারেন।
তবে প্রথম বোলিং পরিবর্তনেই সাফল্য আসে জিম্বাবুয়ের। নিউম্যান নিয়ামহুরির বলে ব্রায়ান বেনেটের হাতে ক্যাচ দিয়ে ৩৬ রানে ফেরেন মার্শ। এরপর জশ ইংলিসের এজ থেকে দুর্দান্ত একহাতের ক্যাচ নিয়ে তাঁকে ফেরান ব্রেন্ডন টেলর। সেখান থেকেই অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে চাপ বাড়তে থাকে।
কুপার কনোলি অবশ্য একাধিকবার জীবন পান। ৪১ রানে মিডউইকেটে তার ক্যাচ ফেলে দেন বেনেট। এরপর সিকান্দার রাজার নো-বলে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান কনোলি। ফ্রি-হিটে ছক্কা মেরে ফিফটি পূর্ণ করেন তিনি। তবে এর দুই বল পরই রাজার বলে বাইরের এজ এড়িয়ে গিয়ে বোল্ড হন কনলি। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৫১ রান।
অন্যদিকে ম্যাট রেনশর ভাগ্যও তাকে সহায়তা করে। ১২ রানে থাকা অবস্থায় রাজার ফুলটস নিচু করে মিডউইকেটে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ক্যাচটি নিতে পারেননি ক্রেইগ আরভিন।
এরপর সেই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন রেনশ। স্পিনারদের কিছুটা ওপরে ওঠানো বল পেয়ে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন তিনি। ব্রায়ান বেনেটের বলে হাঁটু গেড়ে মিডউইকেট দিয়ে ছক্কা হাঁকান। ওয়েলিংটন মাসাকাদজার বলে তাঁর পরের ছক্কাটি গিয়ে পড়ে স্টেডিয়ামের ছাদে। অ্যালেক্স ক্যারের সঙ্গে রেনশর জুটি দাঁড়ায় ৭২ রানের। পরে ইভান্সের বলে গালি অঞ্চলে ক্যাচ দিয়ে ৪০ রানে ফেরেন ক্যারি।
রেনশ তখন ফিফটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। মাসাকাদজাকে আবারও ছক্কা মেরে ৫৫ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন তিনি। এরপর অলি পিকের সঙ্গে দ্রুত রান তুলতে থাকেন। ১০ ওভার বাকি থাকতে অস্ট্রেলিয়ার রান দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ২২৮।
অলিভার পিক ৩০ বলে ৪০ রান করে হিট উইকেট হয়ে ফিরলে অস্ট্রেলিয়ার শেষ দিকের রান তোলার দায়িত্ব আরও বেশি করে পড়ে রেনশর ওপর। নিয়ামহুরির চতুর্থ শিকার হন জেভিয়ার বার্টলেট। তখন রেনশর রান ৯৬। হাতে মাত্র তিন উইকেট। চার ওভার বাকি। শেষ পর্যন্ত এভান্সের ফুলটসে এক রান নিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। তাঁর দ্বিতীয় পঞ্চাশ এসেছে মাত্র ৩৩ বলে।
শেষ পর্যন্ত ১০৯ রানে থামেন রেনশ। তার ইনিংসেই অস্ট্রেলিয়া ৮ উইকেটে ২৯৪ রান সংগ্রহ করে। ওয়ানডেতে এটি রেনশর প্রথম সেঞ্চুরি।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শেষ হওয়ার আগে নিজের পঞ্চম উইকেটও তুলে নেন নিয়ামহুরি। রেনশর ক্যাচে তাকে ফেরান জিম্বাবুয়ে। সব মিলিয়ে ১০ ওভারে ৬২ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়ে শেষ করেন এই বাঁহাতি পেসার।
এর ফলে ২০ বছর ২৩৯ দিন বয়সে ওয়ানডেতে পাঁচ উইকেট নেওয়া সবচেয়ে কম বয়সী জিম্বাবুইয়ান বোলার হয়ে যান তিনি। অভিষেকের পরপরই এমন পারফরম্যান্স তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য বড় এক মাইলফলক।
২৯৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বিপদে পড়ে জিম্বাবুয়ে। বেন কারান দ্বিতীয় বলেই আউট হন। জেভিয়ার বার্টলেটের বলে মিডঅফে নাথান এলিসের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। ব্রায়ান বেনেটও অল্পের জন্য বেঁচে যান। স্পেন্সার জনসনের বলে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে তাঁর ক্যাচ নিতে পারেননি কনলি।
ইনোসেন্ট কাইয়াকে প্রথমে এলবিডব্লিউ দেওয়া হলেও রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান তিনি। কিন্তু পরের ওভারেই এলিসের ধীরগতির বলে ভুল করে মিডউইকেটে ক্যাচ দেন কাইয়া। অ্যালেক্স ক্যারি নিচু হয়ে দুর্দান্ত ক্যাচ নেন। এরপর জশ ইংলিসের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন বেনেট। মাত্র ৯ ওভার শেষে ৪৬ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে জিম্বাবুয়ে বড় চাপে পড়ে।
নিজের ব্যাটিংয়ের পর বল হাতেও সাফল্য পান রেনশ। লংঅনে ক্যাচ দিয়ে ব্রেন্ডন টেলরকে ফেরান তিনি। তখন মনে হচ্ছিল বড় ব্যবধানে জিততে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু জিম্বাবুয়ের অভিজ্ঞ দুই ব্যাটার ক্রেইগ আরভিন ও সিকান্দার রাজা ম্যাচে ফেরান দলকে। সতর্ক ব্যাটিং করে ধীরে ধীরে রান বাড়াতে থাকেন তাঁরা।
রেনশকে আক্রমণ করে আরভিন একটি ছক্কা ও একটি চার মারেন। অন্যদিকে রাজা শুরুতে সময় নিলেও পরে গতি বাড়িয়ে দেন। ৫১ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন আরভিন। তখন রাজা ৪২ বলে ৩৬ রান করেছেন। তবে প্রয়োজনীয় রানরেট ক্রমেই বাড়ছিল। ৩০ ওভার শেষে জিম্বাবুয়ের জয়ের জন্য প্রতি ওভারে প্রায় সাত রান করে প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।
ঠিক তখনই বোলিংয়ে ফেরেন নাথান এলিস। আর দ্বিতীয় স্পেলের তৃতীয় বলেই বড় সাফল্য এনে দেন তিনি। তাঁর বল সামান্য বাইরে বেরিয়ে গিয়ে আরভিনের অফ স্টাম্প উড়িয়ে দেয়। এর মধ্য দিয়ে ভেঙে যায় আরভিন ও রাজার ৯৮ রানের পঞ্চম উইকেট জুটি। আরভিন ৫৯ রান করেন।
কিছুক্ষণ পর ফিফটি পূর্ণ করেন রাজাও। কিন্তু জিম্বাবুয়ের জয়ের জন্য তাকে শেষ পর্যন্ত ক্রিজে থাকতে হতো। সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেননি তিনি। জশ জনসনের নিখুঁত ইয়র্কারে বোল্ড হয়ে ৫৭ রানে ফেরেন রাজা। তখন জিম্বাবুয়ের প্রয়োজন ছিল আরও ১১৪ রান, হাতে ছিল মাত্র পাঁচ উইকেট।
এরপর আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি স্বাগতিকরা। ওয়েসলি মাধেভেরে ৪০তম ওভারের প্রথম বলেই আউট হন। শেষ দিকে ব্র্যাড ইভান্সের কাছ থেকে কিছু একটা আশা করেছিল জিম্বাবুয়ে, কিন্তু সেটিও পূরণ হয়নি।
ডেথ ওভারে ফিরে এসে ওয়েলিংটন মাসাকাদজাকে এলবিডব্লিউ করেন এলিস। এরপর ৪৬তম ওভারে ব্যাক-অব-দ্য-লেংথ ধীরগতির বলে নিয়ামহুরিকে বোল্ড করে নিজের পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত ২৩৫ রানে অলআউট হয় জিম্বাবুয়ে। ফলে ৫৯ রানের জয় দিয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শুরু করল অস্ট্রেলিয়া।
এলিস ৩১ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করেন। অন্যদিকে রেনশর ১০৯ রানের সেঞ্চুরি এবং নিয়ামহুরির পাঁচ উইকেট ম্যাচটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। দুই দলের সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হবে শুক্রবার।
আইএইচএস

