দারুণ পারফরম্যান্সে নজরে আসা জীবনের চোখে জাতীয় দলের স্বপ্ন
২০২৪ ও ২০২৬, টানা দুটি যুব বিশ্বকাপ খেলেছেন শেখ পারভেজ জীবন। সবশেষ গত মাসে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে ৩ ম্যাচে নিয়েছেন ১৩ উইকেট। এরপর জিডি ট্রফিতে ৭ ম্যাচে ১৯ উইকেট নিয়ে হয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়। খুলনার মুজগিন্নী এলাকায় জন্ম নেওয়া ২০ বছরের এই তরুণ ক্রিকেটে আসেন জাতীয় দলের তারকা স্পিনার শেখ মেহেদীর হাত ধরে।
বোলিংয়ের বোল্ড ভ্যারিয়েশন, জাতীয় দলের স্বপ্ন এবং জীবনের ক্রিকেটে উঠে আসার নানাদিক নিয়ে জাগো নিউজ-এর সাথে খোলামেলা কথা বলেছেন উদীয়মান অফস্পিন অলরাউন্ডার শেখ পারভেজ জীবন। কথোপকথনের মূল অংশ নিচে তুলে ধরা হলো-
জাগো নিউজ: জিডি ট্রফিতে টুর্নামেন্ট সেরা হলেন, সাফল্যের নেপথ্য কৌশল কী ছিল?
জীবন: যেকোনো টুর্নামেন্টে নামার আগে আমার একটাই লক্ষ্য থাকে-ব্যাটিং ও বোলিং উভয় বিভাগেই দলের জন্য অবদান রাখা। আর এবার প্রতিটি ম্যাচ ধরে ধরে আলাদা পরিকল্পনা করেছিলাম যে নির্দিষ্ট ম্যাচে দলের জন্য কী করতে পারি। আলহামদুলিল্লাহ, টুর্নামেন্ট সেরা হয়ে খুব ভালো লাগছে। তবে দল চ্যাম্পিয়ন হলে আরও ভালো লাগতো।
জাগো নিউজ: এর আগে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ৩ ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে আপনি সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ছিলেন। এরপর জিডি ট্রফিতেও এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার রহস্য কী?
জীবন: ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে কপাল একটা বড় বিষয়, কারণ সবসময় ভালো বল করলেও উইকেট মেলে না। তবে আমার সতীর্থদের বড় অবদান ছিল। অন্য প্রান্ত থেকে তারা দারুণ ডট বল করে চাপ সৃষ্টি করেছে, যার সুবিধা আমি অন্য প্রান্তে পেয়েছি।
জাগো নিউজ: বয়সভিত্তিক অনূর্ধ্ব-১৭ দলের বিপক্ষে বোলিং করার সময় মোটিভেশন কীভাবে ধরে রাখতেন?
জীবন: ওরা তো আমাদের জুনিয়র। ওদের সাথে যদি আমরা খারাপ কিছু করি, তখন মানসিক একটু বেশি প্রেশার কাজ করে-কিরে, তুই ওর কাছে বাউন্ডারি খেলি! ওদের ক্ষেত্রে আরও ফোকাসড থাকা লাগে। এজন্য প্রতিপক্ষ যখন জুনিয়র দল হয়, তখন চ্যালেঞ্জটা ভিন্ন থাকে। তাই জুনিয়রদের বিপক্ষে আমাদের মনোযোগের মাত্রাটা আরও বাড়িয়ে দিতে হয়েছিল।
জাগো নিউজ: প্রথম ম্যাচে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কাছে হারের পর দলের ড্রেসিংরুমের আলোচনা কী ছিল?
জীবন: প্রথম ম্যাচে আমরা সবাই বেশ বাজে ক্রিকেট খেলেছিলাম। পরে দলগত আলোচনায় নিজেদের আসল মানটা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। সবাই উপলব্ধি করি-আমরা যদি আমাদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারি, তবে আমাদের থামানো কঠিন। এরপর সবাই নিজেদের জায়গা থেকে দায়িত্ব নিয়ে পারফর্ম করেছে।
জাগো নিউজ: আপনার বোলিংয়ে ফ্লাইটের ব্যবহার বেশ নজরকাড়া। এই ফ্লাইট কি আপনার শক্তির জায়গা?
জীবন: আমি একটু লুপ দিয়ে বাতাসে বল ওপরের দিকে ভাসিয়ে দিতে পছন্দ করি। বল একটু ওপরে দেখলে ব্যাটাররা আক্রমণাত্মক হতে চায় এবং তখনই তাদের ট্র্যাপে ফেলার সুযোগ তৈরি হয়।
জাগো নিউজ: অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচ হান্নান সরকার আপনার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও লং-রান প্রসেস নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। এই প্রশংসা কতটা অনুপ্রেরণা যোগায়?
জীবন: হান্নান স্যারের অধীনে ২০২৪ সালে ১৯ দলে খেলেছি। উনি আমাকে বেশ স্নেহ করেন এবং সবসময় নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে সঠিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকার পরামর্শ দেন। ওনার এই সমর্থন আমার জন্য বড় প্রেরণা।
জাগো নিউজ: আপনার ক্রিকেটে আসার শুরুর গল্পটা কেমন ছিল?
জীবন: পাড়াতেই বড় ভাইদের সাথে ছোটবেলায় টেপ টেনিস খেলতাম। এলাকার বড় ভাই (শেখ মেহেদী) আমার খেলা দেখে খুলনা ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেন। সেখান থেকেই মূলত অফিশিয়াল ক্রিকেট যাত্রা শুরু।
জাগো নিউজ: পরিবার থেকে শুরুতে কেমন সাপোর্ট পেয়েছিলেন?
জীবন: আব্বু-আম্মু সবসময়ই পাশে ছিলেন। তবে আমার বড় ভাই সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন, ক্রিকেটের শুরুর দিনগুলোতে তিনি ছায়ার মতো আমার সাথে ছিলেন।
জাগো নিউজ: শেখ মেহেদী হাসানের সাথে কি নিয়মিত যোগাযোগ হয়? উনি কী পরামর্শ দেন?
জীবন: মেহেদী ভাই আমার অনেক সিনিয়র এবং আমাকে দারুণ স্নেহ করেন। উনি সবসময় একটাই কথা বলেন-যে প্রসেসে কাজ করছি, সেটাই যেন ধারাবাহিকতার সাথে বজায় রাখি।
জাগো নিউজ: ক্রিকেট ও পড়ালেখার ভারসাম্য বজায় রাখতে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়েছিল?
জীবন: অনূর্ধ্ব-১৯ দলে থাকার সময় পড়ালেখায় কিছুটা বিরতি বা গ্যাপ পড়েছিল। পরিবার স্বাভাবিকভাবেই একটু চিন্তিত হয়ে পড়াশোনায় জোর দিতে বলেছিল। পরে আমি ওনাদের ক্রিকেট নিয়ে আমার সিরিয়াসনেসের বিষয়টি বোঝাই এবং ওনারাও সব শুনে মেনে নেন।
জাগো নিউজ: অফস্পিনার হিসেবে কাকে আইডল মনে করেন বা ফলো করেন?
জীবন: সুনির্দিষ্ট কোনো আইডল নেই, তবে অস্ট্রেলিয়ান অফস্পিনার নাথান লায়নের বোলিং আমার খুব ভালো লাগে। ওনার বোলিং কৌশলগুলো অনুসরণ করার চেষ্টা করি। আর সাকিব ভাইকে তো ছোট থেকেই দেখছি, ফলো করছি।
জাগো নিউজ: সামনেই তো এনসিএল, প্রস্তুতি কেমন চলছে?
জীবন: এখন নিজ শহর খুলনায় প্র্যাকটিস করছি। এনসিএলকে সামনে রেখে বেশ ভালো প্রস্তুতি হচ্ছে।
জাগো নিউজ: খেলার মাঝে ব্রেক পেলে কি পুরোপুরি রিল্যাক্স করেন, নাকি প্র্যাকটিস চলতে থাকে?
জীবন: সত্যি বলতে প্র্যাকটিস না করলে আমার ভালো লাগে না। তাই ছুটির দিনগুলোতেও অনুশীলনের মধ্যেই থাকি। তবে এর ফাঁকে ফাঁকে পরিবারকেও সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। কারণ বছরের বেশিরভাগ সময়েই তো ক্রিকেট নিয়েই ব্যস্ত থাকা লাগে।
জাগো নিউজ: বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে আস্তে আস্তে সিনিয়র ক্রিকেটে প্রবেশ করছেন। এই রূপান্তরটা কীভাবে উপভোগ করছেন?
জীবন: জুনিয়র থেকে সিনিয়রে যাওয়ার এই প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব অনেকাংশে বেড়ে যায়। আমি সবসময় দলের দেওয়া ভূমিকা ঠিকভাবে পালনের চেষ্টা করি এবং সতীর্থদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শেখার মানসিকতা ধরে রাখি।
জাগো নিউজ: খেলোয়াড় হিসেবে আপনার মূল বা আলটিমেট গোল কী?
জীবন: জাতীয় দলের হয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা যেকোনো ক্রিকেটারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, আমারও তাই। তবে বর্তমানে আমার প্রধান লক্ষ্য সঠিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে প্রতিদিন নিজের ক্রিকেটকে আরও উন্নত করা।
জাগো নিউজ: ক্যারিয়ারে প্রথম কোচ দিবাকর রায়ের অবদান কতখানি?
জীবন: দিবাকর স্যার আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় মানুষ। আমার আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে ওনার অবদান অপরিসীম, ওনার কাছে আমি চিরঋণী। ওনার হাত দিয়ে শুরু, তবে আমাকে আজকের জায়গায় নিয়েছেন আরেকজন কোচ, যার নাম সালাউদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল। উনিই মূলত আমাকে প্রতিনিয়ত উন্নতি করার জন্য সাহায্য করেছেন, এখনো করে যাচ্ছেন।
জাগো নিউজ: জাতীয় দল থেকে যদি এখনই ডাক আসে, আপনি কি মানসিকভাবে প্রস্তুত?
জীবন: হ্যাঁ, আমি সবসময় প্রস্তুত থাকি। সুযোগ পেলে নিজের সেরাটা দিয়ে দলের জয়ে অবদান রাখতে চাই।
জাগো নিউজ: বিসিবি নির্বাচকদের নজরে আসার বিষয়ে কীভাবে চিন্তা করছেন?
জীবন: নির্বাচকদের নজর নিয়ে না ভেবে আমি নিজের পারফরম্যান্সে নজর দিতে চাই। আমার কাজ মাঠে রান করা ও উইকেট নেওয়া, আর ওনাদের কাজ দল নির্বাচন করা। আমি নিজের কাজটা ঠিকভাবে করে গেলে সাফল্য একদিন আসবেই।
এসকেডি/এমএমআর


