হাসপাতালে আগুন: সতর্কবার্তা কি এবারও উপেক্ষিত হবে?
হাসপাতাল এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষ জীবন বাঁচানোর আশায় প্রবেশ করে। অথচ সেই হাসপাতালই যদি আগুন, ধোঁয়া ও অপরিকল্পিত সরিয়ে নেওয়ার কারণে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, তবে সেটিকে কেবল একটি দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ভবননিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধের সম্মিলিত ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আটতলা নতুন ভবনে অগ্নিকাণ্ড আবারও সেই অস্বস্তিকর সত্যটি সামনে এনেছে। প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছে, লিফট বা লিফটের নিয়ন্ত্রণকক্ষ-সংশ্লিষ্ট স্থানে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। কোনো প্রতিবেদনে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, কোথাও অতিরিক্ত উত্তাপ, আবার কোথাও সিগারেটের আগুনের সম্ভাবনার কথা এসেছে। লিফট-শ্যাফট দিয়ে ধোঁয়া ও আগুন ওপরের তলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লে রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
হতাহতের সংখ্যা নিয়েও সংবাদমাধ্যমে পরস্পরবিরোধী তথ্য প্রকাশিত হয়েছে—কোথাও মৃত্যুর ঘটনা অস্বীকার করা হয়েছে, কোথাও হুড়োহুড়িতে অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, আবার একটি পরবর্তী প্রতিবেদনে একাধিক মৃত্যুর দাবিও এসেছে। প্রকৃত সংখ্যা নিরপেক্ষ তদন্তে নিশ্চিত করা জরুরি। তবে সংখ্যা যা-ই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট: আগুনের শিখার চেয়ে আতঙ্ক, ধোঁয়া, বিশৃঙ্খলা এবং প্রস্তুতির ঘাটতি অনেক বড় বিপদ তৈরি করেছিল।
ময়মনসিংহের আগুন আমাদের দরজায় কড়া নাড়েনি; দরজা ভেঙে সতর্ক করেছে। সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং জনগণ যদি এবারও না জাগে, পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডকে আর “দুর্ঘটনা” বলা যাবে না। সেটি হবে জানা ঝুঁকিকে উপেক্ষা করার পরিণতি—অর্থাৎ আমাদের সম্মিলিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক ব্যর্থতা।
প্রশ্ন হলো—এটি কি কেবল ময়মনসিংহ মেডিকেলের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের জন্য চূড়ান্ত সতর্কসংকেত?
“শর্টসার্কিট”—দায় এড়ানো জাতীয় শব্দ-
বাংলাদেশে অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথম যে শব্দটি শোনা যায়, সেটি হলো—“শর্টসার্কিট”। এই একটি শব্দ উচ্চারণ করেই যেন তদন্ত শেষ, দায় শেষ এবং কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও শেষ। কিন্তু শর্টসার্কিট কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত-ফল নয়; এটি বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার কোনো গভীর ত্রুটির দৃশ্যমান পরিণতি মাত্র।
কেন শর্টসার্কিট হলো? কেবলটি কি অতিরিক্ত লোড বহন করছিল? সার্কিট ব্রেকারের রেটিং কি সঠিক ছিল? আর্থিং কার্যকর ছিল কি? ইনসুলেশন রেজিস্ট্যান্স পরীক্ষা করা হয়েছিল কি? লিফটের কন্ট্রোল প্যানেল, মোটর, কেবল ও সেফটি ডিভাইসের নিয়মিত পরীক্ষা হয়েছিল কি? তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার আগাম সংকেত শনাক্ত করতে থার্মাল স্ক্যানিং করা হয়েছিল কি? অকার্যকর লিফটের শ্যাফটে ময়লা-আবর্জনা বা দাহ্য পদার্থ জমতে দেওয়া হয়েছিল কেন? লিফট-শ্যাফটের ফায়ার-স্টপিং ও ধোঁয়া প্রতিরোধব্যবস্থা কোথায় ছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে “শর্টসার্কিট” বলা হলো রোগের কারণ না খুঁজে শুধু জ্বরকে দায়ী করার মতো। একটি নতুন ভবনে লিফট বা তার শ্যাফট দিয়ে আগুন ও ধোঁয়া একাধিক তলায় ছড়িয়ে পড়া আরও গুরুতর প্রশ্ন তোলে। প্রতিটি তলায় শ্যাফটের প্রবেশপথ যথাযথ ফায়ার-রেটেড সুরক্ষা পেয়েছিল কি? কেবল ও পাইপ প্রবেশের ফাঁকগুলো অনুমোদিত ফায়ার-স্টপিং উপকরণ দিয়ে বন্ধ ছিল কি? ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ, ফায়ার কম্পার্টমেন্টেশন এবং সুরক্ষিত সিঁড়িঘর কার্যকর ছিল কি? “নতুন ভবন” মানেই নিরাপদ ভবন নয়; নকশা, নির্মাণ, কমিশনিং, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ—এই পাঁচটি স্তরে মান নিশ্চিত হলেই কেবল একটি ভবন নিরাপদ হতে পারে।
আগুন নেভানোর প্রথম দায়িত্ব কার?
ফায়ার সার্ভিস অবশ্যই রাষ্ট্রের প্রধান পেশাদার অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকারী সংস্থা। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের পর যানজট, দূরত্ব ও প্রবেশগত প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছাবে। আগুন লাগার পর প্রথম ৫ থেকে ১০ মিনিটই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—অর্থাৎ “গোল্ডেন মিনিটস”—সম্পূর্ণভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নিজস্ব প্রশিক্ষিত ফায়ার রেসপন্স টিমের হাতে থাকে।
এই সময়ের মধ্যে আগুন শনাক্ত করা, অ্যালার্ম বাজানো, সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা, দরজা বন্ধ করে ধোঁয়ার বিস্তার সীমিত করা, উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র প্রয়োগ করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের পরিকল্পিতভাবে নিরাপদ কম্পার্টমেন্টে সরানো গেলে ছোট আগুন বড় বিপর্যয়ে পরিণত হয় না।
ময়মনসিংহের ঘটনায় তাই শুধু ফায়ার সার্ভিস কত মিনিটে পৌঁছেছে—এই প্রশ্ন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। জানতে হবে, হাসপাতালের অ্যালার্ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করেছিল কি না; নিয়ন্ত্রণকক্ষে সংকেত পৌঁছেছিল কি না; প্রশিক্ষিত ফায়ার টিম কোথায় ছিল; অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, হোস রিল, হাইড্র্যান্ট ও ফায়ার পাম্প ব্যবহার করা হয়েছিল কি না; এবং করা না গেলে কেন করা যায়নি।
কাগজে ফায়ার টিম থাকা আর আগুনের সময় কাজ করার সক্ষমতা এক বিষয় নয়। দেয়ালে ঝোলানো অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র নিরাপত্তা দেয় না—প্রশিক্ষিত হাত সেটিকে কার্যকর করে। রিজার্ভ ট্যাংক বা ছাদে পানির ট্যাংক থাকলেই হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থা কার্যকর হয় না—পাম্প, চাপ, ভালভ, পাইপ, বিদ্যুৎ, বিকল্প শক্তি এবং নিয়মিত পরীক্ষা একসঙ্গে সচল থাকতে হয়।
হাসপাতাল খালি করা সাধারণ ভবন খালি করার মতো নয়-
হাসপাতালে সবাই স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না। এখানে অস্ত্রোপচাররত রোগী, ভেন্টিলেটরে থাকা রোগী, আইসিইউ ও সিসিইউ রোগী, নবজাতক, শিশু, গর্ভবতী নারী, ডায়ালাইসিসে থাকা ব্যক্তি, অক্সিজেননির্ভর রোগী এবং মানসিকভাবে বিভ্রান্ত মানুষ থাকেন। তাদের কাউকে সিঁড়ি দিয়ে দৌড় করিয়ে নামানো যায় না। একজন রোগীকে নিরাপদে সরাতে কখনো একাধিক প্রশিক্ষিত কর্মী, অক্সিজেন, স্ট্রেচার, হুইলচেয়ার, ওষুধ এবং ধারাবাহিক চিকিৎসা-সহায়তা প্রয়োজন হয়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০ মে ২০২৬-এর অগ্নিকাণ্ডে আইসিইউ থেকে রোগী সরানোর সময় একজন রোগীর মৃত্যু এবং নার্সসহ কয়েকজনের আহত হওয়ার ঘটনা আমাদের ইতিমধ্যে সতর্ক করেছিল। মাত্র কয়েক মাস পর ময়মনসিংহের ঘটনা প্রমাণ করল—আমরা প্রথম সতর্কতা শুনিনি।
আন্তর্জাতিকভাবে হাসপাতালে আগুন লাগলে নির্বিচারে পুরো ভবন খালি করার পরিবর্তে আগুনের উৎস নিয়ন্ত্রণ, ধোঁয়ার বিস্তার রোধ এবং ধাপে ধাপে “হরাইজন্টাল ইভাকুয়েশন” বা একই তলার নিরাপদ ফায়ার কম্পার্টমেন্টে রোগী সরানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এরপর প্রয়োজন হলে উল্লম্বভাবে নিচের তলায় বা ভবনের বাইরে স্থানান্তর করা হয়। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর ফায়ার ও স্মোক কম্পার্টমেন্ট, ফায়ার-রেটেড দরজা, সুরক্ষিত করিডর, বিকল্প সিঁড়ি, র্যাম্প, ইভাকুয়েশন চেয়ার এবং রোগীর অবস্থাভিত্তিক অগ্রাধিকার তালিকা।
ময়মনসিংহ মেডিকেলের ভবনে একাধিক বিকল্প বের হওয়ার পথ থাকায় বড় বিপর্যয় সীমিত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু দেশের কতটি জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ক্লিনিক ও বেসরকারি হাসপাতালে দুটি স্বাধীন ও সুরক্ষিত সিঁড়ি আছে? কতটিতে একটি সিঁড়িও দখলমুক্ত? কতটিতে আইসিইউ রোগী স্থানান্তরের মহড়া হয়েছে? প্রশ্নগুলোর সৎ উত্তর আমাদের আতঙ্কিত করবে।
হাসপাতালের অক্সিজেন জীবনও বাঁচায়, আগুনও তীব্র করে-
হাসপাতালে মেডিকেল অক্সিজেন, দাহ্য রাসায়নিক, অ্যালকোহলভিত্তিক জীবাণুনাশক, এলপিজি, জেনারেটরের জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, ব্যাটারি এবং বিভিন্ন গ্যাস ব্যবহৃত হয়। অক্সিজেন নিজে দাহ্য নয়, কিন্তু আগুনকে অত্যন্ত দ্রুত ও তীব্র করে তোলে। একটি ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, অতিরিক্ত গরম যন্ত্র বা ছোট স্ফুলিঙ্গ অক্সিজেনসমৃদ্ধ পরিবেশে ভয়াবহ পরিণতি সৃষ্টি করতে পারে।
তাই মেডিকেল গ্যাস পাইপলাইন, ম্যানিফোল্ড রুম, জোন ভালভ, অ্যালার্ম, সিলিন্ডার সংরক্ষণ ও জরুরি বিচ্ছিন্নকরণব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা আবশ্যক। কোন ওয়ার্ডের অক্সিজেন কোথা থেকে বন্ধ করতে হবে—এ তথ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, প্রকৌশলী ও ফায়ার টিমকে জানতে হবে। আতঙ্কে অক্সিজেন সংযোগ খুলে রোগী টেনে নেওয়া উদ্ধার নয়; সেটি রোগীর জীবনকে নতুন ঝুঁকিতে ফেলা।
এখন শুধু তদন্ত কমিটি নয়—কার্যকর ব্যবস্থা চাই-
সরকারকে অবিলম্বে দেশের সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি হাসপাতালের জন্য সময়সীমাবদ্ধ জাতীয় ফায়ার সেফটি অডিট চালু করতে হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশন, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট ভবন অনুমোদনকারী সংস্থা, গণপূর্ত অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস কর্তৃপক্ষকে একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও যৌথ পরিদর্শন কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।
প্রতিটি হাসপাতালের অনুমোদিত নকশা, ব্যবহার অনুমতি, ফায়ার সেফটি প্ল্যান, ফায়ার লাইসেন্স, বৈদ্যুতিক সিঙ্গেল লাইন ডায়াগ্রাম, আর্থিং পরীক্ষার ফলাফল, ইনসুলেশন রেজিস্ট্যান্স টেস্ট, থার্মাল স্ক্যানিং রিপোর্ট, ফায়ার পাম্প পরীক্ষার রেকর্ড এবং মহড়ার তথ্য যাচাই করতে হবে। শুধু যন্ত্রপাতি আছে কি না দেখলে চলবে না; অ্যালার্ম থেকে পাম্প, পাম্প থেকে হাইড্র্যান্ট, এবং অ্যালার্ম পাওয়ার পর মানুষের প্রতিক্রিয়া—পুরো ব্যবস্থার সমন্বিত পরীক্ষা করতে হবে।
প্রতিটি হাসপাতালে সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষিত ফায়ার সেফটি ম্যানেজার ও শিফটভিত্তিক রেসপন্স টিম থাকতে হবে। চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, নিরাপত্তাকর্মী, প্রকৌশলী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ভূমিকা লিখিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। বছরে অন্তত দুইবার বাস্তবসম্মত মহড়া আয়োজন করতে হবে—দিন ও রাতের শিফটে পৃথকভাবে। আইসিইউ, ওটি, নবজাতক ইউনিট ও ডায়ালাইসিস বিভাগের জন্য আলাদা রোগী-স্থানান্তর পরিকল্পনা থাকতে হবে।
যে হাসপাতাল জরুরি সংশোধনের নির্দেশ অমান্য করবে, তাকে শুধু সতর্কপত্র দিলে চলবে না। ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী নতুন রোগী ভর্তি সীমিত করা, সংশ্লিষ্ট অংশ বন্ধ করা, জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি হাসপাতাল বলে ছাড় কিংবা বেসরকারি হাসপাতাল বলে দরকষাকষি—দুটিই বন্ধ করতে হবে। আগুন সরকারি-বেসরকারি বোঝে না; সে শুধু দুর্বলতা খোঁজে।
আগুনের আগে দায়িত্বশীল হই-
আমাদের দেশে আগুন লাগার পর সবাই সক্রিয় হয়—তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, পরিদর্শন শুরু হয়, ক্যামেরার সামনে কঠোর বক্তব্য দেওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহ পর জনমনের ক্ষত শুকায়, ফাইল বন্ধ হয়, দায়িত্বও ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু একটি হাসপাতালের রোগী ঘুমিয়ে থাকলেও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ঘুমাতে পারে না।
ময়মনসিংহ মেডিকেলের ঘটনা সৌভাগ্যবশত আরও ভয়াবহ হতে পারত। কিন্তু প্রতিবার ভাগ্য রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনার পাহারাদার হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। পরবর্তী আগুনটি যদি গভীর রাতে কোনো আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, নবজাতক ইউনিট বা একমাত্র সিঁড়িসম্পন্ন বেসরকারি হাসপাতালে লাগে, তখন ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
আগুনের পর একজন রোগীকে উদ্ধার করা বীরত্ব; কিন্তু আগুন লাগার আগেই ঝুঁকি দূর করা রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞা। হাসপাতাল মানুষকে বাঁচানোর স্থান—সেখানে নিরাপত্তা কোনো সৌন্দর্যবর্ধক সংযোজন, লাইসেন্স পাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা কিংবা মুনাফার পরে বিবেচিত বিষয় হতে পারে না।
ময়মনসিংহের আগুন আমাদের দরজায় কড়া নাড়েনি; দরজা ভেঙে সতর্ক করেছে। সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং জনগণ যদি এবারও না জাগে, পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডকে আর “দুর্ঘটনা” বলা যাবে না। সেটি হবে জানা ঝুঁকিকে উপেক্ষা করার পরিণতি—অর্থাৎ আমাদের সম্মিলিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক ব্যর্থতা।
লেখক : ফায়ার, ডিজাস্টার অ্যান্ড ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ; সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।
এইচআর/এএসএম


