অদৃশ্য এক আবরণ ওজোন স্তর, যেন পৃথিবীর সানস্ক্রিন
নাহিদ হোসাইন
পৃথিবীর আকাশে এমন এক অদৃশ্য আবরণ রয়েছে, যা প্রতিদিন আমাদের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর অতিবেগুনি বা আল্ট্রাভায়োলেট (ইউভি) রশ্মির বড় একটি অংশ শোষণ করে পৃথিবীর প্রাণ, উদ্ভিদ ও পরিবেশকে সুরক্ষা দেয় এই ওজোন স্তর। অথচ কয়েক দশক আগেও মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে এই সুরক্ষাকবচ ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছিল। সেই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলো যে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নিয়েছিল, তারই অন্যতম প্রতীক বিশ্ব ওজোন দিবস। আজ ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ওজোন দিবস বা আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস।
ওজোন স্তর কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ওজোন হলো তিনটি অক্সিজেন পরমাণু দিয়ে গঠিত একটি গ্যাস-O₃। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে, প্রায় ১০ থেকে ৫০ কিলোমিটার উচ্চতার মধ্যে ওজোনের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি। বায়ুমণ্ডলের মোট ওজোনের প্রায় ৯০ শতাংশ এই স্তরেই রয়েছে।
সহজভাবে বললে, ওজোন স্তর পৃথিবীর জন্য একটি বিশাল প্রাকৃতিক ‘সানস্ক্রিন’ বা ছাতা। সূর্যের ক্ষতিকর ইউভি-বি এবং ইউভি-সি রশ্মির বড় অংশ পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছাতে বাধা দেয়। অতিরিক্ত ইউভি রশ্মি মানুষের ত্বকের ক্যানসার, চোখের ছানি এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। শুধু মানুষ নয়, উদ্ভিদ, সামুদ্রিক জীব ও বিভিন্ন প্রতিবেশব্যবস্থার ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

ফুটপাতে হলুদ টাইলস বসানোর রহস্য জানেন?
কীভাবে শুরু হয়েছিল বিপদ?
বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শিল্প ও প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে। ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, অ্যারোসল, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য শিল্পে ব্যবহৃত ক্লোরোফ্লোরোকার্বন বা সিএফসি, হ্যালন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড, মিথাইল ক্লোরোফর্ম ও মিথাইল ব্রোমাইডসহ কিছু রাসায়নিক বায়ুমণ্ডলে গিয়ে ওজোন অণু ভেঙে ফেলতে পারে।
বিশেষ করে সিএফসি ও হ্যালনের মতো দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক পদার্থ বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে পৌঁছে সূর্যের বিকিরণের প্রভাবে ক্লোরিন ও ব্রোমিন মুক্ত করে। এগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ওজোন অণু ধ্বংস করতে থাকে। ১৯৮০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা অ্যান্টার্কটিকার ওপর ওজোন স্তরে উল্লেখযোগ্য ক্ষয় শনাক্ত করেন। পরিচিত হয়ে ওঠে ‘অ্যান্টার্কটিক ওজোন হোল’ বা ওজোন গহ্বর। এর পরই স্পষ্ট হয় সমস্যাটি কোনো একটি দেশের নয়; এটি বৈশ্বিক সমস্যা।
বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ
ওজোন স্তর রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ১৯৮৫ সালের ভিয়েনা কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব দ্য ওজোন লেয়ার। এর দুই বছর পর, ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ সালে কানাডার মন্ট্রিয়লে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক মন্ট্রিয়াল প্রোটোকল অন সাবস্টেন্সেস দ্যট ডিপলেট দ্য ওজোন লেয়ার।
এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল ওজোন স্তর ধ্বংসকারী রাসায়নিক পদার্থের উৎপাদন ও ব্যবহার ধাপে ধাপে বন্ধ করা। চুক্তিটি ১৯৮৯ সালের ১ জানুয়ারি কার্যকর হয়। মন্ট্রিয়াল প্রটোকলকে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সহযোগিতার অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর অধীনে প্রায় ১০০ ধরনের নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের উৎপাদন ও ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমানো বা বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এ চুক্তির ফলে নিয়ন্ত্রিত ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থের উৎপাদন ও ব্যবহার ৯৯ শতাংশেরও বেশি পর্যায়ে বন্ধ বা পর্যায়ক্রমে বাদ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৬ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সেই থেকে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব ওজোন দিবস।

বিবেকের চোখে গণতন্ত্র ও নৈতিকতা
ওজোন স্তর কি সত্যিই সুস্থ হচ্ছে?
দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ফল এখন বিজ্ঞানীরাও দেখতে পাচ্ছেন। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমও-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর ওজোন স্তর পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। ২০২৪ সালে অ্যান্টার্কটিকার ওজোন গহ্বর সাম্প্রতিক কয়েক বছরের তুলনায় ছোট ছিল। যদিও কোনো একটি বছরের পরিস্থিতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না, দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রবণতার পেছনে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকলে ওজোন স্তর ধীরে ধীরে ১৯৮০ সালের কাছাকাছি অবস্থায় ফিরে আসবে বলে বিজ্ঞানীদের মূল্যায়ন। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে পুনরুদ্ধারের সময় এক নয় এবং অ্যান্টার্কটিকায় পুরোপুরি পুনরুদ্ধারে আরও বেশি সময় লাগতে পারে। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা আছে পরিবেশগত সংকটের সমাধান সম্ভব, যদি বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে কাজ করে।
কিগালি সংশোধনী
ওজোন রক্ষার সাফল্যের পরও নতুন একটি চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। সিএফসি-এর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক, বিশেষ করে হাইড্রোফ্লোরোকার্বন বা এইচএফসি, ওজোন স্তর ধ্বংস করে না; কিন্তু এগুলো শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভূমিকা রাখে।
এই সমস্যা মোকাবিলায় ২০১৬ সালে রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে মন্ট্রিয়াল প্রটোকলে যুক্ত হয় কিগালি সংশোধনী। এর লক্ষ্য এইচএফসি-এর উৎপাদন ও ব্যবহার ধাপে ধাপে কমানো এবং পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী শীতলীকরণ প্রযুক্তির দিকে বিশ্বকে এগিয়ে নেওয়া। ২০২৬ সালে কিগালি সংশোধনীর দশ বছর পূর্ণ হচ্ছে। তাই এবারের বিশ্ব ওজোন দিবসে ওজোন সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, কিগালি সংশোধনী পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে সহায়তা করতে পারে; জ্বালানি-সাশ্রয়ী শীতলীকরণ ব্যবস্থার সঙ্গে এটি আরও বড় সুফল দিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশ উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর দেশ। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরবাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রিজ ও এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবহারও বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতের শীতলীকরণ চাহিদা মেটাতে পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। পুরোনো রেফ্রিজারেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ, সঠিক রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহার, গ্যাসের অনিয়ন্ত্রিত নিঃসরণ বন্ধ করা এবং প্রশিক্ষিত কারিগর তৈরি করাও জরুরি। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষও সচেতন হতে পারেন। এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা অযথা খুব কম না রাখা, নিয়মিত যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ করা, অদক্ষভাবে রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস না ছাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি বেছে নেওয়া এসব ছোট পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
আমাদের দায়িত্ব
ওজোন স্তর রক্ষার ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। পরিবেশ রক্ষায় মানুষ যে সংকট তৈরি করেছে, মানুষই আবার বিজ্ঞান ও সহযোগিতার মাধ্যমে তার সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে। তবে সাফল্য মানেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
ওজোন স্তর রক্ষা মানে শুধু আকাশের একটি স্তর রক্ষা নয়; এর অর্থ মানুষের স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, খাদ্যব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবীকে সুরক্ষিত রাখা। বিশ্ব ওজোন দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই পৃথিবীকে রক্ষা করার কাজটি আকাশের অনেক ওপরে শুরু হলেও এর দায়িত্ব আমাদের সবার হাতে।
কেএসকে



