মমেক হাসপাতালে আগুন: হাজেরা বেগমের মৃত্যু হলো কীভাবে?
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর ছয়জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। নিহতদের তালিকায় থাকা নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার হাজেরা বেগমের পরিচয় পাওয়া গেছে। তিনি পূর্বধলা উপজেলার নারান্দিয়া ইউনিয়নের ভূগী জাওয়ানী গ্রামের আইয়ুব আলীর স্ত্রী। তার বয়স ৫০ বছর।
তবে হাজেরা বেগম কীভাবে মারা গেছেন, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তার পরিবারের সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে হাজেরা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় জানাজা শেষে তার দাফন চলছে। এসময় বাড়ির ভেতরে বসে থাকা কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের।
তারা জানান, বেশ কিছুদিন ধরে নানান অসুস্থতায় ভুগছিলেন হাজেরা বেগম। কয়েক দফা তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সবশেষ তার হার্টে ব্লক ধরা পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে সোমবার সকালে মমেক হাসপাতালে হার্টে রিং প্রতিস্থাপনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। পরে দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।
অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের বক্তব্যের সঙ্গে স্বজন ও বিভিন্ন পর্যায় থেকে আসা তথ্যের মিল না থাকায় পুরো ঘটনা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলার লিফটের নিয়ন্ত্রণকক্ষে আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে ভবনের বিভিন্ন অংশে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করেন। এসময় হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পরপরই হাসপাতাল সূত্র ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর আসে। নিহতদের তালিকায় হাজেরা বেগমের নামও ছিল। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেই মৃত্যুর তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির জানান, হাসপাতালের রেজিস্ট্রার, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স, ফায়ার সার্ভিসের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ তারা পাননি।
বিভাগীয় কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম দিকে যে তালিকাটি তৈরি হয়েছিল, তাতেও ভুল ছিল। তালিকায় মৃত হিসেবে থাকা জাহানারা নামের একজনকে পরে জীবিত ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাওয়া যায়। পাঁচজনের তালিকায় থাকা আরও একজনকে জীবিত পাওয়ার কথা প্রশাসন জানিয়েছে। ফলে প্রথম দিকে প্রচারিত ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
তবে প্রশাসনের বক্তব্যের পাশাপাশি নিহত হাজেরার স্বজনদের ভিন্ন তথ্যও পাওয়া গেছে। হাজেরা বেগমের স্বজনরা কেউ কেউ দাবি করেছেন, আগুনের পর সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হুড়োহুড়িতে পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে। এসময় তার পুত্রবধূ আফরোজা আক্তারও গুরুতর আহত হন। পরে সোমবার রাত নয়টার দিকে তাদের নিজ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।
তবে হাজেরার স্বামী আইয়ুব আলী বলেন, তার স্ত্রীকে নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সোমবার সকালে নিয়ে যান। সেখানে হার্টের ব্লক ধরা পরলে রিং বসানোর কথা ছিল। কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় ওইদিন তিনটার দিকে বাড়িতে তার স্ত্রী মারা যান।
এসময় আইয়ুব আলীর ছেলে মাজহারুল ইসলাম ফারুক এসে দাবি করেন, তার মা হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে মারা যাননি। হাসপাতালে ভর্তিই করানো হয়নি। তিনি হাসপাতালে গেলেও স্ট্রোকজনিত কারণে মারা গেলে সন্ধ্যার আগেই মাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে চলে আসেন। তবে হাসপাতাল থেকে দেওয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে সন্ধ্যা ছয়টা পঁয়ত্রিশে মরদেহটি হাসপাতাল থেকে বের করা হয়েছে। এবং হাসপাতালে প্রবেশের আগেই রোগী মারা যান।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, পূর্বধলা উপজেলার নারান্দিয়া এলাকায় একজন নারী মৃত্যুর খবর পেয়েছি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এরইমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কমিটি আগুন লাগার কারণের পাশাপাশি কোনো গাফিলতি ছিল কি না এবং অগ্নিকাণ্ডের পর হতাহতের ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখবে।
এইচ এম কামাল/এফএ


