দুদকের অভিযানেও বদলায়নি ফুলতলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র
খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বেড়েছে রোগীর চাপ। কিন্তু সে তুলনায় বৃদ্ধি পায়নি সেবার মান। উল্টো রোগীদের জিম্মি করে চলছে ওষুধ ও টেস্ট বাণিজ্য। গত বছর একাধিক অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান হয়। ধরাও পড়ে অনিয়ম। কিন্তু বদলায়নি হাসপাতালের পুরোনো রূপ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির ২৩টি পদের বিপরীতে জনবল আছে মাত্র ছয়জন। আউটসোর্সিং পদে গত অর্থ বছরে ১৯ জন লোক কাজ করেছে। তাদের মধ্যে অনেকে এখন স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন। হাসপাতালে শিশু বেড রয়েছে মাত্র ২টি। রয়েছে একটি মাত্র অ্যাম্বুলেন্স। প্রতিদিন হাসপাতালে গড়ে ৬৫-৭২ জন রোগী ভর্তি থাকেন। আগে যেখানে দৈনিক হাসপাতালে গড়ে ১৫০-২০০ জন রোগীর সেবা দেওয়া হতো সেখানে এখন জরুরি বিভাগ ও আউটডোরে রোজ ৩৫০-৪০০ রোগী আসেন চিকিৎসা নিতে।

হাসপাতালে সরকারিভাবে দেওয়া ওষুধের তালিকায় রয়েছে ৩৯টি পদ। বাকি অতিরিক্ত ওষুধ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ক্রয় করা হয়। গত অর্থ বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকার ওষুধ টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রয় করা হয়েছে। বর্তমানে ভর্তি রোগীদের মধ্যে বেশি আসছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, আউটডোরে প্রতিদিন সকাল থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। দুপুর পর্যন্ত চলে চিকিৎসাসেবা। বহির্বিভাগে শিশু কনসালটেন্ট, মেডিকেল অফিসার, দন্ত বিভাগ, এনসিডি কর্নার, কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারিভাবে ৩০ ধরনের টেস্ট এই হাসপাতালে করার সুযোগ রয়েছে। শিশু কনসালটেন্ট শুক্র ও শনিবার ব্যতীত প্রতিদিন রোগী দেখছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শিশু মাসুমের অভিভাবক পারভিন বলেন, মাসুমের কয়েকদিন ধরে জ্বর জ্বর ভাব। এজন্য হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। প্রতিদিন চিকিৎসক থাকেন। তবে চিকিৎসা সেবা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই বলে তিনি জানান। তবে তিনি ওষুধ সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে চাননি।
জ্বরে আক্রান্ত অন্য একজন রোগী অপর্না বলেন, কয়েকদিন ধরে জ্বর ও কাশি। এজন্য ডাক্তার দেখাতে এসেছি। টিকিট কেটে ডাক্তার দেখিয়েছি। কিছু টেস্ট দিয়েছে। টেস্ট করিয়ে আবার ডাক্তার দেখাবো।
স্থানীয় বাসিন্দা সাদাত হোসেন বলেন, অভিযোগ থাকলেও দিয়ে লাভ নেই। অভিযোগ দিলে চিকিৎসা নিতে এলে বিড়ম্বনায় পড়তে হবে। গতবার শুনেছি দুদক অভিযান চালিয়েছে। অনিয়ম দুর্নীতি খুঁজে পেলেও তৎকালীন কর্মকর্তারা কর্মরত আছেন। স্থানীয়দের এখানে আসতে হয় চিকিৎসা নিতে। অভিযোগ দিয়ে কেউ বিপদে পড়তে চাইবে না। তবে বলতে চাই, ফুলতলা একটি জনবহুল উপজেলা। এখানকার চিকিৎসার সিস্টেম আরও ভালো হওয়া দরকার। জবাবদিহিতা দৃষ্টান্তমূলক হওয়া প্রয়োজন। তাহলে এমনিতেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের দেওয়া খাবারে অনিয়ম প্রতিনিয়ত হচ্ছে। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে রোগী পরিবহন বাবদ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। অ্যাম্বুলেন্সে ফুলতলা থেকে রোগী খুলনায় নিতে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার কথা থাকলেও রোগী প্রতি নেওয়া হয় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। ওষুধ ক্রয়ে গত অর্থ বছরে কমিশন বাণিজ্য হয়েছে। হাসপাতাল থেকে বাড়তি টেস্ট দেওয়া হয়। যা বাইরে থেকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে রোগীদের করতে হয়। নির্ধারিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টেস্ট না করলে অসাধু কিছু ডাক্তার রিপোর্ট দেখতে গড়িমসি করেন। এমনকি কমিশনের ভিত্তিতে রোগীদের অতিরিক্ত ওষুধ লেখা হয়। এগুলো কৌশলে লেখা হয়। এখানকার একটি চক্র এই ওষুধ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। এখানকার স্থানীয় মানুষদের নিরুপায় হয়ে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসতে হয়। বিকল্প সুযোগ না থাকায় ঝামেলা হবে বিধায় অনেক রোগী অভিযোগ করতেও ভয় পান।
এমনকি গত বছর অতিরিক্ত ওষুধ লেখাকে কেন্দ্র একটি ঝামেলাও হয়েছিল। পরে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মধ্যস্থতায় ভুল স্বীকার করে তা সমাধান করা হয়। এছাড়া ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করে একাধিক অনিয়মের সত্যতা পায়। কিন্তু অনিয়ম পেলেও তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা দুদক কর্তৃপক্ষ নেয়নি। উল্টো এখানকার সিন্ডিকেট সন্দেহবসত অনেককে হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। এমনকি এখানকার স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবগত থাকলে পদক্ষেপ নিতে ভয় পান। বিগত সময়ে তিনি রাজনৈতিক বলয় ব্যবহার করে এ হাসপাতালকে জিম্মি করে রেখেছিলেন। এখনো তাই করছেন। অনেকের পরিচয় ব্যবহার করে তিনি স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়ম করে চলেছেন।
দুদক সূত্র জানায়, গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর ফুলতলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হওয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযানে নেতৃত্ব দেন খুলনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রকিবুল ইসলাম। সেসময় রোগীদের জন্য সরকার নির্ধারিত একজনের জন্য ১৫১ গ্রাম মাছ বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৩৯ গ্রাম, পাশাপাশি নিম্নমানের চাল সরবরাহের প্রমাণ, এছাড়া বহির্বিভাগের রোগীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ৩ টাকার পরিবর্তে ৫ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলে প্রমাণ মেলে। এমনকি ডাক্তারদের ব্যবস্থাপত্রে উল্লিখিত ওষুধ সম্পূর্ণভাবে সরবরাহ করা হয় না এবং চিকিৎসকদের যথাসময়ে ফিঙ্গারপ্রিন্টে হাজিরার অনিয়মও ধরা পড়ে। কিন্তু এরপর দীর্ঘদিন দুদক কমিশন না থাকায় প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হলেও ফিরতি কোনো আদেশ না পাওয়ায় প্রতিবেদন আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে।

হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, হাসপাতালের প্রধান কর্মকর্তার নির্দেশেই সবকিছু হয়। তার এলাকার লোক পরসিংখ্যানবিদ তোতা মিয়াকে দিয়ে একাধারে ক্যাশিয়ারের কাজ, স্টোর কিপারের কাজ এবং কমিশন কালেকশানের কাজ করান পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা। তোতা মিয়ার বাড়ি সিরাজগঞ্জ। হাসপাতালে ফর্মাসিস্ট ওষুধ সংরক্ষণের কাজ করলেও আসলে তা করেন তোতা মিয়া। হাসপাতালের নানান অনিয়মের সঙ্গে তোতা মিয়া সম্পৃক্ত।
খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখা এবং তা রোগীকে সেবন করানো একপ্রকার অপচর্চা। এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে সতর্কও করা হয়েছিল। কিন্তু এখনো এমন অনিয়ম এবং অপচর্চা চললেও সংশ্লিষ্টদের অবগত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হবে। এছাড়া অনিয়মের একাধিক অভিযোগ আমরা এরইমধ্যে জানতে পেরেছি। খুব দ্রুত তদন্ত করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে হাসপাতালে গিয়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে হাসপাতালের বিষয়ে ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জেসমিন আরা মুঠোফোনে বলেন, গত অর্থ বছরে পাওয়া সরকারি ওষুধ প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলতি বছরের ওষুধ অক্টোবরে পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। গত অর্থ বছরে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনেক পদের ওষুধ ক্রয় করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মেশিন না থাকায় অনেক টেস্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বর্তমানে থাকা চিকিৎসক ও নার্স এই উপজেলা পরিচালনার জন্য যথেষ্ট। পুরো হাসপাতালে একজন মাত্র পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তার পক্ষে ২৪ ঘণ্টা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করা সম্ভব হয় না। অনেক সময় স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে কাজ করানো হয়।
আউটসোর্সিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, আউটসোর্সিংয়ের নীতিমালায় তাদের প্রক্রিয়া গত জুন মাসে শেষ হয়ে গেছে। এখন শুনছি নতুন করে টেন্ডার হবে। গত সময়ে ১৯ জন আউটসোর্সিং কর্মী ছিল। তারা অনেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন। নতুন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কেউ যদি সুযোগ পান তাহলে তারা বেতন পাবেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন যদি বলি ভাই আপনি সাংবাদিক, আপনি অমুক জায়গা থেকে রিপোর্ট করার ভয় দেখিয়ে টাকা নিছেন। এটা বলাটা কি ঠিক হবে? আপনি যদি তথ্য প্রমাণ না দেখাতে পারেন তাহলে তো ব্যাপারটা উল্টো দিকে যাবে। আপনি হাসপাতালে একদিন আসেন। শহর থেকে আসার আগে ফোন দিয়ে এলে ভালোভাবে তথ্য দিতে পারবো।
খুলনার সিভিল সার্জন ডা. মোছা. মাহফুজা খাতুন বলেন, শুধু ফুলতলা নয়, আমার এখানেসহ সব উপজেলাতে জনবল সংকট রয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে আমি প্রথম জানলাম। তথ্য প্রমাণসহ অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এফএ
