যত্রতত্র নয়, বৃক্ষরোপণ হোক পরিকল্পিত
সৈয়দ মাজারুল ইসলাম রুবেল
বৃক্ষরোপণ বলতেই আমাদের এক শ্রেণির মানুষ কেবল মহাসড়কের পাশে গাছ লাগানোকে বোঝেন। কিন্তু আমি এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। বৃক্ষরোপণ মানেই মহাসড়ক কিংবা মহাসড়কের ডিভাইডারে গাছ লাগানো নয়। কোথায় কোন ধরনের গাছ লাগানো হবে সেটিই হওয়া উচিত বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান বিষয়।
মহাসড়ক কিংবা ডিভাইডারের মাঝখানে দীর্ঘ শাখা-প্রশাখাযুক্ত বড় গাছ লাগানো অনেক ক্ষেত্রে উপকারের চেয়ে ক্ষতির কারণ হতে পারে। ঝড়, ঘূর্ণিঝড় কিংবা দুর্যোগের সময় এসব গাছের ডাল ভেঙে যানবাহন ও পথচারীর ওপর পড়তে পারে। গাছ উপড়ে গিয়ে সড়ক বন্ধ হওয়া কিংবা দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই ডিভাইডার ও সংকীর্ণ সড়ক এলাকায় বড় ও বিস্তৃত শাখা-প্রশাখাযুক্ত গাছের পরিবর্তে ছোট আকৃতির, ছাঁটাইযোগ্য ও সৌন্দর্যবর্ধক ফুলের গাছ লাগানো অধিক যুক্তিযুক্ত।
অন্যদিকে, মহাসড়কের পাশে পর্যাপ্ত জায়গা থাকলে সড়ক থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে উপযুক্ত প্রজাতির মাঝারি বা বড় গাছ লাগানো যেতে পারে। তবে গাছের শিকড়, ভবিষ্যৎ আকার, শাখা-প্রশাখা এবং ঝড়ের সময় সম্ভাব্য ঝুঁকি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।
স্থানভেদে গাছের শ্রেণি নির্বাচন জরুরি
গ্রাম, গঞ্জ, শহর ও জনপদে পরিকল্পিতভাবে পার্ক, খোলা জায়গা কিংবা নির্দিষ্ট সবুজ এলাকা তৈরি করে সেখানে বৃক্ষরোপণ করা যেতে পারে। বকুল, জারুল, সোনালু, কাঠগোলাপসহ নান্দনিক ও উপযোগী গাছ শহুরে পরিবেশে ব্যবহার করা যেতে পারে। গ্রাম ও বসতবাড়ির আশপাশে ফলদ ও ছায়াদানকারী গাছ বেশি উপযোগী। আম, কাঁঠাল, জাম, পেয়ারা, লিচু, আমড়া, নারিকেলসহ বিভিন্ন ফলদ গাছ একই সঙ্গে খাদ্য, ছায়া ও পরিবেশগত সুবিধা দিতে পারে।
পুকুর ও খালের পাড়ে গাছ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার। এখানে বড় ও ঘন শাখা-প্রশাখাযুক্ত গাছের পরিবর্তে তাল, সুপারি, খেজুর ও নারিকেল গাছের মতো উপযোগী প্রজাতি পরিকল্পিতভাবে লাগানো যেতে পারে। এসব গাছের পাতা ও শাখা-প্রশাখা পানির ওপর তুলনামূলকভাবে কম বিস্তৃত হয়। ফলে জলাশয়ে অতিরিক্ত পাতা ও জৈব আবর্জনা জমে পানি দূষণ বা পলি জমার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা রক্ষার জন্য নিয়মিত পলি অপসারণ, দখলমুক্ত রাখা এবং পানির প্রবাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিদ্যালয় ও খেলার মাঠের চারপাশে ছায়াদানকারী, নিরাপদ এবং স্থানীয় পরিবেশে ভালোভাবে বেড়ে ওঠে এমন গাছ লাগানো যেতে পারে। তবে খেলার জায়গার একেবারে পাশে ঝুঁকিপূর্ণ বা অতিরিক্ত বিস্তৃত শাখা-প্রশাখাযুক্ত গাছ না লাগানোই ভালো।
বনাঞ্চল বা সংরক্ষিত বৃক্ষায়ন এলাকায় শুধু একটি প্রজাতির গাছের বাগান না করে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির সমন্বয়ে বন তৈরি করা উচিত। এতে পাখি, কীটপতঙ্গসহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার সুযোগ তৈরি হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গাছ লাগানোই শেষ কথা নয়; কোথায়, কী উদ্দেশ্যে এবং কোন শ্রেণির গাছ লাগানো হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তার জন্য এক ধরনের গাছ, জলাশয়ের পাড়ের জন্য আরেক ধরনের গাছ, শহরের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ভিন্ন ধরনের গাছ এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জন্য স্থানীয় প্রজাতি নির্বাচন করতে হবে।
বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ঝড়, ঘূর্ণিঝড় ও অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি আমাদের রয়েছে। তাই শুধু গাছ লাগানোর সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা না করে স্থান নির্বাচন, গাছের প্রজাতি, শিকড়ের বিস্তার, উচ্চতা, শাখা-প্রশাখা, মাটির ধরন এবং জননিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে বৃক্ষরোপণ করা প্রয়োজন।
প্রতিটি শহর, গ্রাম, গঞ্জ, ইউনিয়ন কিংবা জনপদে পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট বনাঞ্চল বা সংরক্ষিত বৃক্ষায়ন এলাকা গড়ে তোলা প্রয়োজন। রাস্তার পাশে বিচ্ছিন্নভাবে গাছ লাগানোর পাশাপাশি এমন স্থায়ী সবুজ অঞ্চল তৈরি করা গেলে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব।
সবচেয়ে বড় কথা, গাছের শ্রেণিবিন্যাস না বুঝে যেখানে-সেখানে গাছ লাগানোও কখনো কখনো মানুষের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। তাই বৃক্ষরোপণকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি হিসেবে না দেখে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, স্থানীয় পরিবেশ ও জননিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বৃক্ষরোপণের সাফল্য শুধু গাছের সংখ্যায় নয়; সাফল্য হলো সঠিক স্থানে সঠিক প্রজাতির গাছ লাগিয়ে একটি নিরাপদ, সুন্দর, জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ ও টেকসই সবুজ পরিবেশ তৈরি করা।
লেখক: পরিবেশ ও গণমাধ্যম কর্মী
কেএসকে




