‘এআই আমাদের মেরে ফেলবে’, ভয়ে চাকরি ছাড়লেন গুগলের দুই গবেষক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত দ্রুত উন্নত হচ্ছে, ততই বাড়ছে এর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। এবার সেই আশঙ্কা আরও জোরালো করেছে গুগল ডিপমাইন্ডের দুই গবেষকের পদত্যাগ। তাদের একজন বিলাল চুঘতাই প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, এআইয়ের বর্তমান বিকাশের গতিপথ নিয়ে তিনি এতটাই উদ্বিগ্ন যে মনে করছেন, মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য এই প্রযুক্তি বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিলাল চুঘতাই গুগল ডিপমাইন্ডে এজিআই সেফটি ও অ্যালিগমেন্ট নিয়ে কাজ করতেন। অর্থাৎ অত্যাধুনিক এআই যেন মানুষের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সেই ধরনের নিরাপত্তা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত নিজের বক্তব্যে তিনি জানান, গুগল ডিপমাইন্ড ছেড়ে দিয়েছেন এবং এআইয়ের বর্তমান অগ্রগতির ধারা তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে।
কেন চাকরি ছাড়লেন বিলাল?
চুঘতাইয়ের বক্তব্যের মূল উদ্বেগ এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি। তার মতে, কয়েক বছরের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যা আগে কল্পনা করাও কঠিন ছিল। একই সঙ্গে এআই সিস্টেমের নিরাপত্তা ও সারিবদ্ধকরণ গবেষণা সেই গতিতে এগোচ্ছে কি না, তা নিয়ে তার প্রশ্ন রয়েছে।
নিজের বিবৃতিতে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অত্যন্ত উন্নত বা সুপার ইন্টেলিজেন্ট এআই তৈরি হলে সেটি মানুষের সক্ষমতাকে অনেক ক্ষেত্রেই ছাড়িয়ে যেতে পারে। তার বক্তব্য অবশ্য একটি গবেষকের ব্যক্তিগত সতর্কতা; এটি প্রমাণিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
একই পথে আরেক ডিপমাইন্ড গবেষক
বিলালই প্রথম নন। এর আগেও গুগল ডিপমাইন্ডের এজিআই সেফটি টিমের গবেষক জোস অ্যাঞ্জেলস সংস্থাটি ছাড়ার কথা জানান। ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। অ্যাঞ্জেলসের বক্তব্য ছিল, এআই উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট দ্রুত এগোচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই তার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিপমাইন্ড ছাড়ার পর অ্যাঞ্জেলস অন্য এআই সংস্থায় যাওয়ার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং পরে এআই এভালুয়েশন ও সেফটি নিয়ে কাজ করা মিটারে যোগ দেন। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু বাইরে থেকে এআই নিয়ে সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যে গবেষকেরা সরাসরি উন্নত এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের কয়েকজনও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে প্রকাশ্যে সতর্ক করছেন।
‘এআই কি সত্যিই মানুষকে শেষ করে দিতে পারে?’
এই প্রশ্নের সরল উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। এআই সেফটি গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ভবিষ্যতে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী এবং স্বায়ত্তশাসিত সিস্টেম তৈরি হলে মানুষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে এমন এআই নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, যা নিজে সিদ্ধান্ত নিতে, জটিল কাজ সম্পন্ন করতে কিংবা নতুন সিস্টেম তৈরিতে সাহায্য করতে পারবে।
তবে এসব আশঙ্কা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে পূর্ণ ঐকমত্য নেই। এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বাস্তব ঝুঁকি যেমন সাইবার হামলা, ভুল তথ্য, প্রতারণা, গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও চাকরির ওপর প্রভাব এবং মানবসভ্যতার বিলুপ্তির মতো দীর্ঘমেয়াদি আশঙ্কাকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে এআই এজেন্টের স্বায়ত্তশাসন ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে ঘটনাগুলো অবশ্য বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই এজেন্ট শর্মার মাধ্যমে ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশ ও পরীক্ষামূলক পরিবেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো ঘটনা নিয়ে শিল্পমহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এবার এআইয়ের গতি কমানোর ডাক
এই বিতর্কের মধ্যেই অ্যানথ্রোপিকের সিইও ডারিও আমোডি এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, এআই মডেলের সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, নিরাপত্তা যাচাই ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা যেন তার পেছনে পড়ে না যায়।
আমোডির প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়ন, এআই সংস্থাগুলোর ওপর আরও কার্যকর নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরির উদ্যোগ। তিনি উন্নত এআই তৈরি পুরোপুরি বন্ধ করার কথা বলেননি; বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য উন্নয়নের গতি ‘পেস’ করার কথা বলেছেন।
আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তার এই অবস্থানের সঙ্গে প্রকাশ্যে সহমত জানিয়েছেন ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআই-এর ইলন মাস্ক। অল্টম্যান জানান, এআই বর্ডার-এর উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন বলে তিনি আমোডি-এর সঙ্গে একমত।
তাহলে কি এআই উন্নয়ন থেমে যাবে?
বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। এআই এখন প্রযুক্তি, ব্যবসা, গবেষণা ও জাতীয় প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ফলে একটি সংস্থা গতি কমালেও অন্য সংস্থা বা অন্য দেশ একই গতিতে প্রযুক্তি উন্নত করতে থাকলে প্রতিযোগিতার চাপ থেকেই যেতে পারে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এআই সক্ষমতা নিয়ে প্রতিযোগিতা এই আলোচনাকে আরও জটিল করেছে। একই সঙ্গে এআই সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থও রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা বাড়ানো এবং প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
কেএসকে




