সারাদিন চ্যাট-কলে কথা, দেখা হলে কেন মুখে কথা আসে না
ডেটিংয়ের শুরুটা কখনো কখনো রূপকথার মতো মনে হতে পারে। কয়েক সপ্তাহ ধরে কারো সঙ্গে নিয়মিত মেসেজ, দীর্ঘ ফোনালাপ, রাত জেগে গল্প আর ছোট ছোট বিষয়ে হাসিঠাট্টা-সব মিলিয়ে মনে হতে থাকে, অবশেষে হয়তো সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটির দেখা মিলেছে।
মেসেজে কথার যেন শেষই নেই। একে অন্যের রসিকতায় হাসি, পছন্দ-অপছন্দে মিল, কথার ধরনেও বোঝাপড়া। ফোনে কথা বললেও মনে হয়, দুজনের মধ্যে যেন বহুদিনের পরিচয়। স্বাভাবিকভাবেই এরপর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত-প্রথমবার সামনাসামনি দেখা।
কিন্তু দেখা হওয়ার পরই অনেকের মনে হতে পারে, এ মানুষটি কি সত্যিই সেই একই মানুষ, যার সঙ্গে অনলাইনে এত ভালো জমেছিল? সামনাসামনি বসার পর কথাই যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনলাইনে যে মানুষটি এত মজার, প্রাণবন্ত ও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, বাস্তবে তিনি হয়ে পড়েছেন বেশ চুপচাপ। কথোপকথনে বারবার বিরতি, অস্বস্তিকর নীরবতা-সব মিলিয়ে অনলাইনের সেই ‘কেমিস্ট্রি’ যেন হঠাৎ করেই উধাও।
অনলাইনের কেমিস্ট্রি বাস্তবে সবসময় একই রকম থাকে না
চ্যাটে সাবলীল হলে বাস্তবে অস্বস্তি হতে পারে
এর পেছনে বেশ কিছু স্বাভাবিক কারণ থাকতে পারে। বিশেষ করে যারা সামাজিক পরিস্থিতিতে কিছুটা বেশি চিন্তা করে কথা বলেন বা সামনাসামনি মিশতে সময় নেন, তাদের জন্য বিষয়টি আরও কঠিন হতে পারে।
মেসেজের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো-উত্তর দেওয়ার আগে ভাবার সময় পাওয়া যায়। কী লিখবেন, কোন শব্দ ব্যবহার করবেন, কথাটা মজার করে বলা যায় কি না ভেবে নেওয়ার সুযোগ থাকে। কোনো উত্তর পছন্দ না হলে সেটি মুছে আবার লেখা যায়।
ফলে অনলাইনে একজন মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী, বুদ্ধিদীপ্ত কিংবা রসিক দিকটি তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু সামনাসামনি কথোপকথনে সেই সময়টুকু পাওয়া যায় না। প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। ফলে মাথায় থাকা সুন্দর কথাটিও অনেক সময় ঠিকমতো মুখে আসে না।
সামনে বসলে সবকিছুই বোঝা যায়
চ্যাটে কথার পাশাপাশি দেখা যায় মূলত লেখা, কখনো ছবি বা ইমোজি। কিন্তু সামনাসামনি দেখা হলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা।
কথার সঙ্গে যুক্ত হয় চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, শরীরী ভাষা এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। অন্য ব্যক্তি আপনার কথা শুনে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন, সেটিও মুহূর্তেই বোঝা যায়।
মেসেজে কেউ হয়তো কোনো মজার কথার উত্তরে হাসির ইমোজি পাঠালেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি সত্যিই হাসলেন কি না, কথাটি তার ভালো লাগল কি না-তা মুখের অভিব্যক্তি থেকেই বোঝা যায়। তাই অনলাইনের যোগাযোগ অনেক সময় বাস্তব মিথস্ক্রিয়ার তুলনায় অসম্পূর্ণ ছবি দেয়।
অনলাইনের মানুষটি কি তাহলে ‘ভুল’?
অনলাইনে একজন মানুষ নিজের স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বই প্রকাশ করতে পারেন, আবার সামনাসামনি পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত নার্ভাস হয়েও যেতে পারেন।
বিশেষ করে প্রথম দেখা করার আগে দুজনের মনেই যদি অনেক প্রত্যাশা তৈরি হয়ে যায়, তাহলে চাপ আরও বাড়তে পারে। ‘কথা যেন ভালো হয়’, ‘অন্যজন আমাকে পছন্দ করুক’, ‘কোনো ভুল যেন না হয়’-এমন চিন্তা স্বাভাবিক কথোপকথনকেও কঠিন করে তুলতে পারে।
ফলে প্রথম দেখাতেই অনলাইনের মতো স্বচ্ছন্দ হতে না পারা মানেই যে দুজনের মধ্যে কোনো সম্ভাবনা নেই, তা নয়।
প্রথম ডেট খারাপ হলেই কি সম্পর্ক শেষ
সবসময় নয়। প্রথম দেখা মূলত দুজন মানুষের জন্যই একটি নতুন পরিস্থিতি। অনলাইনে কয়েক সপ্তাহ কথা বলার পর হঠাৎ বাস্তবে দেখা হলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তাই প্রথম সাক্ষাতে অস্বস্তি হলে একে অপরকে কিছুটা সময় দেওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়বার দেখা করার পর হয়তো কথাবার্তা অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। ধীরে ধীরে কমতে পারে জড়তা, তৈরি হতে পারে স্বাচ্ছন্দ্য।
তবে সময় দেওয়ার অর্থ এই নয় যে অস্বস্তি বা অনাগ্রহকে জোর করে উপেক্ষা করতে হবে। কয়েকবার দেখা ও কথা বলার পরও যদি মনে হয় যোগাযোগে স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি হচ্ছে না, তাহলে নিজের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
কারণ সত্যিকারের বোঝাপড়া শুধু চ্যাটের অসংখ্য মেসেজ বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনালাপে তৈরি হয় না। একজন মানুষ আপনার পাশে বাস্তবে কেমন অনুভূতি তৈরি করেন, কীভাবে কথা বলেন এবং দুজনের মধ্যে স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি হয় কি না, সেটিও সম্পর্ক বোঝার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই অনলাইনে দারুণ কেমিস্ট্রি থাকার পর প্রথম দেখায় যদি একটু অস্বস্তি হয়, সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুর ইতি টেনে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার শুধু অনলাইনের ভালো লাগার কারণে বাস্তবের অস্বস্তিকেও উপেক্ষা করা ঠিক নয়। দুজনকে একটু সময় দিন-তারপরই হয়তো পরিষ্কার হবে, এটি শুধু ভালো চ্যাটিংয়ের সম্পর্ক, নাকি সত্যিই আরও কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
সূত্র: ভেরি ওয়েল মাইন্ড, আমেরিকান ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন
এসএকেওয়াই



