মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের অস্ত্র মোতায়েন করেছে?

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
পৃথিবীর কক্ষপথে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র মোতায়েন করেছে—এমন ঘোষণার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, আসলে কী ধরনের অস্ত্র সেখানে পাঠানো হয়েছে? মহাকাশে সামরিক শক্তি বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় এই অস্ত্রের ভূমিকা কী হতে পারে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা। তবে ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত অস্ত্রটির বিষয়ে খুব বেশি তথ...

পৃথিবীর কক্ষপথে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র মোতায়েন করেছে—এমন ঘোষণার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, আসলে কী ধরনের অস্ত্র সেখানে পাঠানো হয়েছে? মহাকাশে সামরিক শক্তি বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় এই অস্ত্রের ভূমিকা কী হতে পারে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা।

তবে ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত অস্ত্রটির বিষয়ে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর সচিব ট্রয় মেইঙ্ক জানিয়েছেন, শত্রুপক্ষের হামলা থেকে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষিত রাখতে কক্ষপথে থাকা এই অস্ত্র প্রয়োজনীয়। তবে অস্ত্রটির ক্ষমতা কী, কখন এটি মহাকাশে পাঠানো হয়েছে বা কীভাবে এটি কাজ করে—এসব বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

কী ধরনের অস্ত্র হতে পারে?

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) সহযোগী গবেষক এবং ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোপলিটিকস বিশেষজ্ঞ ড. ব্লেডিন বোয়েন মনে করেন, এটি ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা রেডিও সংকেত বাধাগ্রস্ত করার কোনো ব্যবস্থা হতে পারে।

বিবিসি রেডিও ফোরকে তিনি বলেন, এমন একটি অস্ত্র হলে সেটি তুলনামূলকভাবে কম ধ্বংসাত্মক উপায়ে শত্রুর কৃত্রিম উপগ্রহের যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করতে পারে।

পৃথিবীতে এ ধরনের প্রযুক্তি আগে থেকেই রয়েছে। কোনো উপগ্রহের সঙ্গে মাটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারলে সেটি কার্যত অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।

তবে আরও ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বোয়েনের মতে, এর মধ্যে থাকতে পারে এমন কোনো ‘কাইনেটিক কিল ভেহিকল’, যা অন্য একটি উপগ্রহের সঙ্গে সরাসরি ধাক্কা খেয়ে সেটিকে ধ্বংস করতে পারে।

আরেকটি সম্ভাবনা হতে পারে এমন কোনো কৃত্রিম উপগ্রহ, যা অন্য উপগ্রহের কাছে গিয়ে সেটিকে পর্যবেক্ষণ, আঁকড়ে ধরা বা তার গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।

মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা নতুন নয়

মহাকাশে সামরিক কার্যক্রম অবশ্য নতুন কোনো বিষয় নয়। মহাকাশ যুগের শুরুর দিক থেকেই বিভিন্ন দেশ সেখানে সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। ১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘ইস্ত্রেবিতেল স্পুতনিকভ’ বা ‘স্যাটেলাইট ডেস্ট্রয়ার’ কর্মসূচির আওতায় এমন কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি করেছিল, যেগুলো অন্য উপগ্রহের দিকে ধাতব টুকরো বা প্রজেক্টাইল ছুড়ে সেগুলো ধ্বংস করতে পারত।

বর্তমানে সামরিক শক্তিধর দেশগুলো মহাকাশে নানা ধরনের কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবহার করে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নিরাপদ যোগাযোগ, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করা এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্য নির্ধারণের মতো কাজে এসব উপগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রে মহাকাশভিত্তিক সামরিক সরঞ্জামের ব্যবহারও তত বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাশিয়া ও চীনের কাছেও কি এমন অস্ত্র আছে?

যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাশিয়া ও চীনের কাছেও কক্ষপথে একই ধরনের অস্ত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

রুসির সাবেক গবেষক জুলিয়ানা সুয়েস বিবিসিকে বলেন, রাশিয়া ও চীন—দুই দেশই মহাকাশে এমন কিছু কার্যক্রম চালিয়েছে, যা তাদের সম্ভাব্য মহাকাশ অস্ত্র সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।

রাশিয়ার ক্ষেত্রে এমন কিছু কর্মকাণ্ড দেখা গেছে, যা কক্ষপথে থাকা দুটি উপগ্রহের মধ্যে অস্ত্র পরীক্ষার সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়। কোনো একটি পরীক্ষায় কক্ষপথে প্রজেক্টাইল ছোড়া হয়ে থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হয়েছে।

গত এক দশকে রাশিয়া ও চীন মহাকাশে ‘রেন্ডেভু অ্যান্ড প্রক্সিমিটি অপারেশন’ বা আরপিও বাড়িয়েছে। এর মাধ্যমে একটি উপগ্রহ অন্য একটি উপগ্রহের খুব কাছে গিয়ে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ বা অনুসরণ করতে পারে।

কিংস কলেজ লন্ডনের রাশিয়ান প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক ড. রড থর্নটনের মতে, এ ধরনের উপগ্রহ ভবিষ্যতে ‘হান্টার-কিলার’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এগুলো অন্য উপগ্রহের সঙ্গে ধাক্কা দিতে পারে কিংবা সেটিকে কক্ষপথ থেকে সরিয়ে দিতে পারে।

চীনের ‘স্পেস টাগ’ প্রযুক্তির কথাও উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এই প্রযুক্তিতে একটি মহাকাশযান অন্য একটি উপগ্রহের কাছে গিয়ে সেটিকে আঁকড়ে ধরে অন্য কক্ষপথে সরিয়ে নিতে পারে।

এ ধরনের প্রযুক্তি মহাকাশের আবর্জনা সরানোর মতো শান্তিপূর্ণ কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব। আবার একই প্রযুক্তি সক্রিয় সামরিক উপগ্রহ অচল করতেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

বড় ঝুঁকি মহাকাশের আবর্জনা

মহাকাশে অস্ত্র ব্যবহারের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো ধ্বংসাবশেষ বা স্পেস জাঙ্ক তৈরি হওয়া।

কিংস কলেজ লন্ডনের মহাকাশ নিরাপত্তা ও অস্ত্রায়ন বিশেষজ্ঞ ড. মার্ক হিলবোর্ন বলেন, সরাসরি ভূমি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংস করার পরীক্ষায় বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ তৈরি হতে পারে।

২০০৭ সালে চীনের একটি অ্যান্টি-স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার উদাহরণও সামনে এসেছে। ওই পরীক্ষার ফলে তৈরি ধ্বংসাবশেষের অনেক অংশ এখনও কক্ষপথে রয়েছে এবং বিপজ্জনক হয়ে আছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

মহাকাশে সামান্য একটি বস্তুতেও বড় ক্ষতি হতে পারে। কারণ কক্ষপথে বস্তুগুলো অত্যন্ত বেশি গতিতে চলাচল করে। ফলে ছোট একটি ধাতব বা প্লাস্টিকের টুকরোও কোনো উপগ্রহে আঘাত করলে গুরুতর ক্ষতি করতে পারে।

পারমাণবিক অস্ত্রের আশঙ্কাও রয়েছে

মহাকাশে সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

থর্নটনের মতে, রাশিয়ার হাতে এমন স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা মহাকাশে উঠে নিম্ন কক্ষপথে থাকা উপগ্রহে আঘাত করতে পারে। উচ্চতা থেকে বিমান থেকেও অ্যান্টি-স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতা রয়েছে বলে তিনি জানান।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর তুলনায় রাশিয়ার হাতে কম সংখ্যক উপগ্রহ থাকায় মস্কো অ্যান্টি-স্যাটেলাইট অস্ত্রের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে। থর্নটন বলেন, চরম পরিস্থিতিতে মহাকাশে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হলে এর ফলে তৈরি তড়িৎচৌম্বকীয় পালস বা ইএমপি বিস্তীর্ণ এলাকার সুরক্ষাহীন উপগ্রহ অচল করে দিতে পারে।

তবে মহাকাশে এমন পারমাণবিক সংঘাত আলাদাভাবে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মহাকাশে বড় ধরনের সংঘাত হলে সেটি পৃথিবীর সামরিক সংঘাতের সঙ্গেও যুক্ত থাকার সম্ভাবনা বেশি।

কেন এখন এই ঘোষণা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণা মহাকাশে অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে একেবারে নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা নয়। বরং এটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত একটি বার্তাও হতে পারে।

বোয়েনের মতে, চীনের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত আধুনিকায়নের বিষয়টি এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। গত তিন দশকে চীন মহাকাশে বিপুলসংখ্যক সামরিক উপগ্রহ পাঠিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সম্ভাব্য লক্ষ্যও বেড়েছে।

অন্যদিকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পর মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে সতর্ক করেছে। তবে বোয়েনের মতে, রাশিয়া ও চীন নিজেরাও মহাকাশে বিভিন্ন ধরনের সামরিক প্রযুক্তি তৈরি ও ব্যবহার করছে।

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এবং ভারত—সব দেশই বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টি-স্যাটেলাইট বা মহাকাশ প্রতিরোধী অস্ত্র তৈরি করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতের সংঘাতে উপগ্রহ, ক্ষেপণাস্ত্র, লেজার এবং কক্ষপথে চলাচলকারী বিশেষ যান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশও বড় শক্তিগুলোর সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

সূত্র: বিবিসি

এমএসএম

Original Source
https://www.jagonews24.com/international/news/1157825
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in World