জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
শহীদুল জহির’র লেখা ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসটা পড়েছিলাম বেশ আগে। উপন্যাসের কাহিনি অতটা মনে নেই। তবে আমার অভিজ্ঞতা হলো রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে জীবনের বাস্তবতা বদলে যায়। বদলে যায় বিশ্বাস, বদলে যায় সামাজিকতা, বদলে যায় আচার। যারা অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে পৃথিবীর দিকে...

শহীদুল জহির’র লেখা ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসটা পড়েছিলাম বেশ আগে। উপন্যাসের কাহিনি অতটা মনে নেই। তবে আমার অভিজ্ঞতা হলো রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে জীবনের বাস্তবতা বদলে যায়।

বদলে যায় বিশ্বাস, বদলে যায় সামাজিকতা, বদলে যায় আচার। যারা অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকান তারা অবশ্য এটাকে সহজভাবেই নেন। আর যারা অন্ধভাবে সবকিছুই বিশ্বাস করেন তাদের আশাভঙ্গ হয়। হৃদয় এবং মন ভেঙে যায়। বাকি জীবন কাটাতে হয় এক অব্যক্ত হাহাকার নিয়ে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যাওয়াটা একেবারেই অবশ্যম্ভাবি ছিল। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে স্থানিক এবং বৈশ্বিক কার কি স্বার্থ জড়িত ছিল। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে কার লাভ হলো আর কার ক্ষতি হলো। সেটা গবেষণার বিষয়। কিন্তু স্থানীয়ভাবে যে জনজোয়ার তৈরি হয়েছিল সেটা সত্যি।

অনেক মানুষই মনে মনে এমন একটা ঘটনার প্রত্যাশায় ছিলেন। যদিও সেটা সাহস করে প্রকাশ করেননি। তাহলে নিজের ভাগ্যের আকাশে শনির চাঁদ দেখার পাশাপাশি জীবনও হুমকির মুখে যেতে পারতো। আর স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা এগুলোর কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করেনি। গোড়ামি দিয়ে সবকিছু মোকাবিলা করেছে। যার ফলে হয়েছে মচকানোর আগেই ভেঙে পড়া।

একটা পুরো প্রজন্ম বেড়ে উঠেছিল কোনো প্রকার ভোটাধিকার প্রয়োগ ছাড়াই। কোন দ্বিরুক্তি করলেই তাদের টুটি চেপে ধরা হতো। তাদের রাস্তার বাস ট্রাক দিয়ে পিষে মেরে ফেলার বিচার চাইলে উল্টো তাদেরকেই রাস্তায় ফেলে আবার উত্তম মধ্যম দেয়া হতো। এভাবে বড় হতে হতে তাদের ভিতরে যেন এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভা জমা হয়ে ফুঁসে উঠছিল।

সেগুলোকে একটা রাজনৈতিক দল খুবই সুচারুভাবে ব্যবহার করেছিল। যদিও খাতা কলমে তারা ছিল নিষিদ্ধ এবং তাদের কোন বাস্তব কর্মকাণ্ড ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা হলো দলের মধ্যে যখন গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত থাকে তখন আসলে দমন পীড়ন করে তাদের থামিয়ে রাখা যায় না। কারণ একজনের পর একজন এসে দলের হাল ধরে।

তারা অবশ্য অনেক আগে থেকেই মেধাবী ছাত্রদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছিল। যেখানে বড় বড় দলগুলো শুধুমাত্র শহর কেন্দ্রীক রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর ব্যস্ত ছিল নিজের, পরিবারের এবং আত্মীয়স্বজনের আখের গুছাতে। সেখানে এই দলটা একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে নিয়ে গেছে বছরের পর বছর। কারণ তারা জানতো ফলাফল একদিনে আসবে না।

তারা যে চারাগাছ রোপণ করছে সেটা একদিন মহীরুহ হবেই হবে। আর বাংলাদেশের প্রকৃত মেধাবীরা তো আসলেই গ্রাম থেকে আসে। তাদের যদি স্কুল পর্যায় থেকে দলে টানা যায় তাহলে তারাই একদিন বড় হয়ে দলের নেতৃত্ব দিবেন। তাই তারা বেছে বেছে গ্রামের স্কুলের মেধাবীদের পেছনে সময় ব্যয় করেছেন।

তাদের আরেকটা বড় হাতিয়ার ছিল ধর্ম। যারফলে তাদের দল করলে ইহকালে যেমন সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের নিঃশ্চয়তা আছে তেমনি আছে আখেরাতের অনন্ত শান্তি। তাই বাবা মায়েরাও তাদের সন্তানদের উৎসাহ দেন। সে সন্তান ছেলেই হোক বা মেয়ে। যার ফলে তৈরি হয়েছে বিশাল এক ভারসাম্যের কর্মীবাহিনী।

সেই বাহিনী অন্যদের তুলনায় এগিয়ে ছিল সবসময়। কারণ অন্যান্য দলের ছাত্র সংগঠন যখন চাঁদাবাজি আর ক্যাম্পাস দখলে ব্যস্ত তখন তারা ব্যস্ত ছিল জনসংযোগে আর পঠনে। পঠনের ফলে তাদের মগজ এমনভাবে ধোলায় হয়েছে যে সেটার বাইরে তাদের আর যাওয়ার সাহস বা বিশ্বাস কোনটাই ছিল না।

এই ছাত্র শক্তি তারা এমনভাবে তৈরি করেছে যে তাদের নিজেদের বিকল্প যেমন নিজেরাই। আবার তারা অন্যদেরও বিকল্প। যার ফলে পুরো মাঠই ছিল তাদের দখলে। যদিও অন্যরা ভাবতো উল্টোটা। এরপর যখন ফুঁসে উঠার সুযোগ এলো তখন আর তারা সেটা হাতছাড়া করেনি। সবাইকে নিজেদের পক্ষে টানতে সক্ষম হয়েছিল।

ক্ষমতার পট পরিবর্তন করতে পেরেছিল। যদিও এখন তারা খাতা কলমে ক্ষমতায় নেই কিন্তু যারা বাস্তবতাটা জানেন তারা বুঝেন যে তাদের মেধাবী ছাত্র শক্তি দেশের সব জায়গায়, সব স্তরে, সব সেক্টরে আছে। এটাকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোন মতামত নেই। কারণ তারা যদি আসলেই বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করে তাহলে পুরো দেশেরই ভাগ্য বদলে দেবে।

বঙ্গীয় বদ্বীপে শাসনভার বদলেছে সময়ের সাথে কিন্তু আপামর জনগণের ভাগ্য একটুও বদলায়নি। তারা বেঁচে থাকে অদৃষ্টের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে। তারা বিশ্বাস করেন যে একজন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একজন আছেন। যিনি তাদের প্রতি বছরের পর বছর হয়ে যাওয়া অন্যায় অবিচার দেখছেন। তিনিই এর বিধান করবেন। সেটা যদি ইহকালে নাও পাওয়া যায় পরকালে তাদের জন্য অপার শান্তি অপেক্ষা করছে।

এই বিশ্বাসের জায়গাটা সেই বিশেষ দল এবং তাদের ছাত্র সংগঠন খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিল। যার ফলে তাদেরও দলে টানতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। এছাড়াও শহরের যে সামান্য শিক্ষিত জনগোষ্ঠি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভক্ত তাদের সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় বোধ অন্যদের চাপিয়ে দেওয়া। কিন্তু গ্রামীণ জনগোষ্ঠির সংস্কৃতি এবং বিশ্বাস তাদের জীবনাচারেরই অংশ। তাই যখনই এই দুটো মুখোমুখি হয়েছে তখন গ্রামীণ বিশ্বাসই জয়যুক্ত হয়েছে।

যাইহোক একটা দেশ তো আসলে অনেক রকমের মানুষের মিলিত জনগোষ্ঠি। শুধু একটা গোষ্ঠির স্বার্থ দেখলে সেখানে সুশাসন নিশ্চিৎ করা যায় না। এই দলের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা এখানেই। আরো একটা বিষয় এখানে উল্লেখ্য। সেটা হলো তারা তাদের দলীয় ধ্যান ধারণার কারণেই দেশের স্থানিক এবং বৈশ্বিক পরিবর্তনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে সবসময়ই।

সেটা যে ভুল ছিল সেটা স্বীকার করার মতো সাহস তারা এখনও সঞ্চয় করতে পারেনি। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে পরিবর্তনের ফসলগুলো কিন্তু তারা ঠিকই নিজেদের ঘরে তুলেছে। ভুল স্বীকার করতে না পারুক যখনই সুযোগ পেয়েছে সেই পরিবর্তনকে তারা অস্বীকার করেছে। এটাই তাদের ব্যক্তি এবং দলের চরিত্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। এটা ভীষণ রকমের ভন্ডামি এবং হঠকারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। অনেকটা নিজের পিতৃপরিচয় অস্বীকার করার মতো।

এই দলটা এখন শুধু দেশেই না আন্তর্জাতিকভাবেও প্রচণ্ড রকমের শক্তিশালী। দেশে দেশে তাদের শাখাগুলো নিভৃতে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠনগুলো যেখানে নিজেদের মধ্যে মারামারিতে শতবিভক্ত সেখানে তারা দলের গণতন্ত্র মেনে সব কাজ পরিচালনা করে যাচ্ছে।

এমনকি তারা বিভিন্ন দেশের স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করছে এবং নির্বাচিত হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনির স্থানীয় রাজনীতিতে এদের অংশগ্রহণ খুবই বেশি। এমনকি বিভিন্ন স্থানীয় কাউন্সিলে তাদের নির্বচিত প্রতিনিধিও আছে। আছে নিজেদের জন্য আলাদা উপাসনালয়। যেভাবে তারা এগিয়ে যাচ্ছে তারা খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের ক্ষমতাও জয় করবে। অবশ্য এখনও তারায় ক্ষমতায় আছে যদিও খাতা কলমে অন্য একটি দল দেশ পরিচালনা করছে।

সময়ের সাথে সবকিছুই বদলায়। আর এটাই জীবনের স্বাভাবিক ধর্ম। মানুষ বদলাবে। তার বিশ্বাস বদলাবে। রাজনীতিও বদলাবে। সমাজনীতি বদলাবে। তার সাথে সাথে বদলে যাবে দেশ। যে যত সহজভাবে এটাকে নেবে তার জীবন তত সহজ হবে। আর এখনকার বাস্তবতায় আমি যাদের কথা বললাম তাদের ক্ষমতায় আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

অন্যভাবে বললে তারা আসলে এখনও ক্ষমতায় আছে। তাদের এর ক্ষমতায় আসা বা থাকা নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু তারা যেন অন্যান রাজনৈতিক দলের মতো শুধুমাত্র নিজেদের দলের লোকেদের ভালোর কথা না ভেবে দেশের সামগ্রিক ভালোর কথা ভাবেন। এটাই আমার চাওয়া। কিন্তু তারা যেভাবে ইতিহাসকে পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাতে আমি তাদের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারি না।

লেখক: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

এমআরএম

Original Source
https://www.jagonews24.com/probash/news/1157840
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in World