গুগলের চাকরি-মিস ইউনিভার্স ইন্ডিয়ার মঞ্চ, উমাঙ্গা নারীদের অনুপ্রেরণা
সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিস যাওয়ার প্রস্তুতি। হাতে ল্যাপটপ, সঙ্গে ব্যাকপ্যাক আর ইয়ারবাড। তারপর বেঙ্গালুরুর গুগল ক্যাম্পাসে পৌঁছে দিনের কাজ শুরু। কাজের ফাঁকে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্টোরি দেওয়া ‘ওয়ার্ক’ এই রুটিন শুনলে মনে হতে পারে, এটি কোনো সাধারণ প্রযুক্তিকর্মীর গল্প। কিন্তু এই গল্পের মানুষটি কিছুদিন আগেই ছিলেন ভারতের অন্যতম আলোচিত সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চে। তিনি উমাঙ্গা কুমাওয়াট একজন ক্লাউড ইঞ্জিনিয়ার, আবার মিস ইউনিভার্স ইন্ডিয়া ২০২৬-এর টপ ২০ ফাইনালিস্ট।
উমাঙ্গার সাম্প্রতিক যাত্রার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, মিস ইউনিভার্স ইন্ডিয়ার মঞ্চে অংশ নেওয়ার পরও তিনি নিজের প্রযুক্তি পেশা ছেড়ে দেননি। বরং প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর আবার ফিরে গেছেন গুগলের বেঙ্গালুরু অফিসে। ১৪ সেপ্টেম্বর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক মিনিটের ‘ডে ইন মাই লাইফ’ ভিডিওতে সেই কর্মজীবনের ঝলকও দেখিয়েছেন তিনি।

প্রযুক্তির জগৎ থেকেই শুরু
উমাঙ্গার পেশাগত পরিচয় মূলত প্রযুক্তির সঙ্গে। তার প্রকাশ্য পেশাগত প্রোফাইল অনুযায়ী, তিনি গুগলে ক্লাউড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। ক্লাউড প্রযুক্তি, অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট এবং জেনারেটিভ এআই-সংক্রান্ত দক্ষতার কথাও তার পেশাগত প্রোফাইলে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিনের কর্মজীবনের বড় অংশই কোড, প্রযুক্তি, ডেটা ও ক্লাউড অবকাঠামোর মতো বিষয় ঘিরে। কিন্তু প্রযুক্তির এই ব্যস্ত জীবনের পাশাপাশি তার আরেকটি স্বপ্নও ছিল সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চে নিজেকে তুলে ধরা। সেই স্বপ্ন তাকে নিয়ে যায় মিস ইউনিভার্স ইন্ডিয়া ২০২৬-এর প্রতিযোগিতায়।
বেঙ্গালুরুর অফিস থেকে জয়পুরের মঞ্চ
২০২৬ সালের জাতীয় পর্যায়ের এই প্রতিযোগিতায় উমাঙ্গা মধ্যপ্রদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২৩ আগস্ট জয়পুরে অনুষ্ঠিত ফাইনালে মোট ৫২ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তিনি জায়গা করে নেন টপ ২০-তে। শেষ পর্যন্ত জাতীয় মুকুট তার মাথায় ওঠেনি; কেরালার কাজিয়া লিজ মেজো মিস ইউনিভার্স ইন্ডিয়া ২০২৬-এর খেতাব জেতেন।
তবে উমাঙ্গার গল্প এখানেই শেষ হয়নি। বরং তার ক্ষেত্রে মঞ্চের আলো নিভে যাওয়ার পর শুরু হয়েছে আরেকটি পরিচিত অধ্যায় অফিসের ডেস্কে ফেরা। সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি আবার গুগলের বেঙ্গালুরু ক্যাম্পাসে ফিরে যান। সেখানে নেই র্যাম্প, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ কিংবা মঞ্চের দর্শক। আছে ল্যাপটপ, কাজের নথি, মিটিং, কফি ব্রেক আর প্রতিদিনের অফিস রুটিন।

একদিনের দুই রকম জীবন
উমাঙ্গার প্রকাশ করা ভিডিওটি মূলত তার সেই স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ছবিই তুলে ধরেছে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দিনের প্রস্তুতি শুরু। পোশাক বেছে নিয়ে ল্যাপটপ, ব্যাকপ্যাক ও ইয়ারবাড নিয়ে রওনা দেন অফিসের দিকে।
কাজ শুরুর আগে গুগলের ওয়েলনেস সেন্টারেও সময় কাটাতে দেখা যায় তাকে। ট্রেডমিলে হাঁটা, স্ট্রেচিং ও কিছু ব্যায়ামের পর শুরু হয় কাজের পালা। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাকে দেখা যায় ল্যাপটপ খুলে নথি পর্যালোচনা করতে।
দুপুরের খাবারের সময়ও ছিল বেশ সাধারণ। গুগলের ক্যাফেটেরিয়ায় নানা ধরনের খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও উমাঙ্গা বেছে নেন নুডল স্যুপ ও সবুজ শাকসবজি। এরপর আবার কাজে ফেরেন। বিকেলে কিছু সময় শান্ত পরিবেশের একটি লাউঞ্জে বসেও কাজ করতে দেখা যায় তাকে। সাড়ে ৫টার দিকে আসে কফি বিরতি। তারপর দিনের কাজ গুটিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে যান তিনি। এসব গল্প জানা যায় তার সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন পোস্ট থেকেই। মিস ইউনিভার্স ইন্ডিয়ার মঞ্চ থেকে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানেই যেন ফিরে এলেন সেই পরিচিত কর্মজীবনে।
কেন উমাঙ্গার গল্প আলাদা?
সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার সঙ্গে সাধারণত মডেলিং, অভিনয় কিংবা বিনোদন জগতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে বেশি করে যুক্ত করা হয়। উমাঙ্গার ক্ষেত্রে ছবিটা কিছুটা ভিন্ন। জাতীয় পর্যায়ের একটি বড় সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পরও তার পেশাগত পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু রয়ে গেছে প্রযুক্তি।
একদিকে গুগলের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ক্লাউড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ, অন্যদিকে জাতীয় সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতকে একই জীবনে পাশাপাশি রাখার অভিজ্ঞতাই তাকে আলোচনায় এনেছে।
তবে উমাঙ্গার গল্পকে শুধু ‘বিউটি উইথ ব্রেইন’ ধরনের একটি পরিচয়ে আটকে রাখলে তার যাত্রার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। কারণ তার সাম্প্রতিক প্রকাশিত জীবনচিত্রে সবচেয়ে স্পষ্ট যে বিষয়টি, তা হলো একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া তার পেশাগত পরিচয়কে সরিয়ে দেয়নি।

মুকুট না পেলেও থেমে থাকেননি
মিস ইউনিভার্স ইন্ডিয়ার মুকুট শেষ পর্যন্ত অন্য একজনের মাথায় উঠেছে। উমাঙ্গা জায়গা করে নিয়েছেন টপ ২০-তে। কিন্তু প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর তার পরবর্তী পদক্ষেপটি ছিল নিজের পুরোনো জীবনে ফিরে যাওয়া। এখানেই তার যাত্রার সবচেয়ে সাধারণ অথচ আকর্ষণীয় দিকটি ধরা পড়ে। একদিকে কয়েক হাজার দর্শকের সামনে র্যাম্পে হাঁটা, অন্যদিকে পরদিনের মতোই ল্যাপটপ খুলে কাজের টেবিলে বসা। আলো ঝলমলে মঞ্চ আর নিরিবিলি অফিস-দুই জগতের ব্যবধান বিশাল। অথচ উমাঙ্গার জীবনে দুটিই এখন পাশাপাশি থাকা দুটি অধ্যায়।
মিস ইউনিভার্স ইন্ডিয়ার মঞ্চ তার পরিচিতির পরিধি বাড়িয়েছে, কিন্তু গুগলের অফিসে ফিরে আসা দেখিয়েছে তার পেশাগত যাত্রা সেখানেই থেমে নেই। বরং মঞ্চের অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়েই তিনি ফিরেছেন নিজের কর্মজীবনে।
উমাঙ্গা কুমাওয়াটের গল্প তাই আপাতত কোনো চূড়ান্ত গন্তব্যের গল্প নয়। এটি এমন এক যাত্রা, যেখানে প্রযুক্তির ক্যারিয়ার আর ব্যক্তিগত স্বপ্ন একে অপরকে সরিয়ে দেয়নি। কখনো তিনি ক্যামেরার সামনে, কখনো কম্পিউটারের সামনে। কখনো র্যাম্পে, কখনো অফিসের ডেস্কে।
আর সেই কারণেই তার সাম্প্রতিক জীবনের সবচেয়ে পরিচিত ছবিটি হয়তো মুকুট পরা কোনো মুহূর্ত নয় বরং গুগলের ডেস্কে বসে আবার কাজে ফিরে যাওয়ার সেই স্বাভাবিক দৃশ্য। উমাঙ্গার গল্প পুরো বিশ্বের অন্যান্য নারীদের জন্য এক বিশেষ বার্তা দেয়, যে ইচ্ছা থাকলে যে কোনো পরিস্থিতি সামলে নিজের স্বপ্ন পূরণ করুন।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, গালফ নিউজ
কেএসকে


