সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্ত হচ্ছে দেশি ধানের জাত
দেশে খাদ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উচ্চ ফলনশীল (উফশি) ধানের চাষ। বেশি ফলনের আশায় কৃষকেরা ধীরে ধীরে দেশি ও স্থানীয় জাতের ধান চাষ থেকে সরে আসছেন। এতে একদিকে উফশি ধানের আবাদ বাড়ছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় জাতের ধান।
হাওর-বাঁওড় ও কৃষিজমি ঘেরা মৌলভীবাজারে আমন ধানের চাষই সবচেয়ে বেশি। তবে সময়ের সঙ্গে বোরো ও আউশ ধানের আবাদও বেড়েছে। জেলার তিন মৌসুমেই স্থানীয় জাতের ধানের পরিবর্তে উফশি জাতের চাষে কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। চলতি বছরও বোরো, আউশ ও আমন-তিন মৌসুমেই উফশি ধানের চাষ হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
কৃষিবিদদের মতে, এসব ধানে ফলন বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে জমির উর্বরতা কমছে। পাশাপাশি স্থানীয় জাত সংরক্ষণ ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় গবেষণার ঘাটতিতে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি জাতের ধান।
‘এ জেলায় সবচেয়ে বেশি উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ করা হয়। কৃষকেরা আগ্রহ নিয়ে তা চাষ করেন। কৃষকেরা মনে করেন টাকা খরচ করে চাষ করছি ফলন বেশি পেতে হবে। এজন্য দেশি জাতের ধান চাষে আগ্রহ হারিয়েছেন।’
জেলার কৃষকেরা জানান, কৃষিতে ফসল বেশি পাওয়ার আসায় প্রায় সব কৃষক উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান চাষ করছেন। ধান চাষে গত কয়েকবছরে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এজন্য কৃষকেরা যে জাতের ধান বেশি ফলন হয় এই জাতের প্রতি ঝুঁকেছেন। সরকার থেকেও উচ্চ ফলনশীল ধানের বীজ দেওয়া হয়। এক দশক আগেও দেশি জাতের প্রচুর ধান চাষ করেছেন কৃষকেরা। দেশি ধান উৎপাদন কম হলেও স্বাদ অনেক বেশি। দেশি ধানের চেয়ে উফশি ও হাইব্রিড ধানের ফলন প্রায় দ্বিগুণ। সরকারের উচিত দেশি প্রজাতির ধানকে গবেষণার মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল জাতে রূপান্তর করা।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনমি অ্যান্ড হাওর অ্যাগ্রিকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নূর হোসেন মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের দেশে ১৫ থেকে ২০ বছর আগে হাওর বা নন হাওর এলাকায় যে দেশীয় ধান চাষ করা হতো এগুলো এখন আর পাওয়া যায় না। এগুলো নিয়ে বিদেশিরা সংরক্ষণ করলেও আমাদের দেশে পুরোপুরিভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। যদিও জিন গবেষণা কেন্দ্রে আমাদের কিছু ধান সংরক্ষণ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমি দেখেছি জার্মানে আমাদের দেশীয় লোকাল প্রজাতির কয়েক হাজার জাতের ধান সংরক্ষণ করা আছে। তারা নিয়মিত এগুলো নিয়ে গবেষণা করে। তবে আমাদের দেশে এগুলো নিয়ে গবেষণা কম হয়। আমাদের দেশীয় জাতের ধানে পুষ্টি ও স্বাদ অনেক বেশি এছাড়া জলবায়ুর সঙ্গে ঠিকে থাকতে পারে। হাইব্রিড ধানের উৎপাদন বেশি দেশীয় ধানের চেয়ে। দেশীয় ধান প্রতি একর জমিতে যা উৎপাদন হয় এরচেয়ে দ্বিগুণ বেশি উফশি ও হাইব্রিড ধান উৎপাদন হয়। এতে কৃষকেরা লাভবান হন।
ড. মোহাম্মদ নূর হোসেন মিয়া বলেন, আমাদের দেশে দেশীয় ধানের নম্বর রেজিস্ট্রার এবং বীজ সংরক্ষণের অভাবে তা বিলুপ্ত হচ্ছে। উন্নত দেশে জার্মপ্লাজম সেন্টারে গবেষণা করে বীজ সংরক্ষণ করে। আমাদের দেশি ধান গবেষণা করে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। দেশি জাতের কয়েক হাজার প্রজাতির ধান ছিল, এখন আর নেই।
‘আমাদের দেশে স্থানীয় জাতের ধান নিয়ে ব্যাপকভাবে গবেষণা করা প্রয়োজন। দেশীয় জাতের ধান গবেষণার মাধ্যমে যদি একটু ফলন বাড়ানো যায় তাহলে কৃষকেরা আগ্রহ নিয়ে তা চাষ করবেন। গ্রামের বড় ও মাঝারি কৃষকেরা শতশত বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন। তাদের হাতে দেশীয় জাতের ধানের বীজ দিলে আগ্রহ নিয়ে কিছু জমিতে হলেও ধান চাষ করবেন। উচ্চ ফলনশীল বা হাইব্রিড জাতের ধান চাষের কারণে জমির উর্বরতাও কমে যায়। দেশীয় জাতের ধানগুলো যেনো একেবারে হাঁড়িয়ে না যায় এজন্য সরকারের উচিত ব্যাপকভাবে গবেষণা করা।’
মৌলভীবাজার কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ৯৮ হাজার ৩০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২৯৫ হেক্টর জমিতে দেশি স্থানীয় জাতের ধান ও ১৭৫ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড জাতের ধান চাষ করা হয়েছে। বাকি জমিতে উফশি ধান চাষ করা হয়েছে। দেশীয় ধানের চেয়ে উফশি জাতের ধানে খরচ একটু বেশি হলেও ফসল উৎপাদন হয় কয়েক গুণ বেশি। বিশেষ করে কৃষকেরা উচ্চ ফলনশীল ব্রি ধান ১২২, ৯৮, ২৮, ২৯ সহ বিভিন্ন জাতের ধান বেশি চাষ করছেন। এতে করে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ আমন ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা যায়, চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধান গাছ কালচে রঙ ধারণ করেছে। পুরো ফসলের মাঠ কৃষকেরা অধিক লাভের আসায় উচ্চ ফলনশীল (উফশি) ধান চাষ করছেন। বেশিরভাগ কৃষকেরা বাজারের কৃষিঘর নামে দোকান থেকে বীজ কিনে রোপণ করেছেন। হাতেগোনা কয়েকজন কৃষক ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য অল্পসংখ্যক জমিতে দেশি জাতের ধান চাষ করছেন। ধান কাটা ও মাড়াই পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো থাকলে ফলন ভালো হওয়ার আশা করছেন। দেশি ধান একর প্রতি ৩৫-৪০ মণ পাওয়া গেলে উফশি বা হাইব্রিড ধান ৭০-৮০ মণ পাওয়া যায়। উচ্চ ফলনশীল জাতে ফলন বেশি হওয়ায় এসব জাত চাষে কৃষকের আগ্রহ বেশি।

কৃষক সাদিকুর রহমান, রেজওয়ান মিয়া জানান, একদশক আগেও ব্যাপকভাবে চিনিগুঁড়া ও কালজিরা, বিন্নি, শালি, ফুল বালাম, লক্ষ্মীবিলাস, লোহাজাং, পাইজম, লালচল্লিশসহ শতশত দেশীয় জাতের ধান চাষ করেছেন তারা। যখন এসব ধান চাষ করতেন তখন পরের বছর আবার চাষের জন্য এসব ধানের বীজ সংরক্ষণ করতেন। তবে ধীরে ধীরে সবকিছু হারিয়ে গেছে।
তারা আরও জানান, এখন হাতে গোনা কয়েকজন কৃষক শখ করে বিন্নি বা কালজিরা ধান চাষ করছেন, তাও হয়তো মাত্র কয়েক শতক জমিতে। সব কৃষক এখন অধিক ফলনের আশায় উচ্চ ফলনশীল জাত চাষ করছেন। এতে করে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। সবমিলিয়ে কৃষকেরা দেশীয় জাতের ধান চাষে আগ্রহ হারিয়েছেন। বাজারে বা সরকার থেকে হাইব্রিড বা উফশি জাতের ধানের বীজ দেওয়া হয় চাষের জন্য।
জেলার রাজনগর উপজেলার কৃষক মিজান আহমেদ বলেন, আমি নিজে থেকেই অনেক চেষ্টা করছি দেশি জাতের ধান চাষ করার জন্য। তবে বীজ সংরক্ষণ করতে পারিনি। এখন শখের বসে ১৫ শতক জায়গায় সুগন্ধি কালজিরা বা স্থানীয়ভাবে (নি ধান) বলে এসব চাষ করি। এই জায়গায় দেড় থেকে দুই মণ ধান চাষ হয়। স্থানীয় বাজারে ১০০ থেকে ১২০ টাকা প্রতি কেজি চাল বিক্রি করা যায়। আমরা চাই দেশি জাতের অন্তত কিছু জাত রূপান্তর করে কৃষকদের মধ্যে বীজ দেওয়া হোক।
কৃষক আদিল আহমেদ বলেন, আমরা প্রতি বছর আমন, বোরো ও আউশধান চাষ করি। আমাদের প্রায় ৪০ একর জমি আছে। কৃষিতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এজন্য দেশি জাতের ধান চাষ করে পোষায় না। দেশি ধানের চেয়ে দ্বিগুণ ফলন হয় উফশি জাতের ধানে। আমরা নিজেদের খাওয়ার জন্য কালজিরা ও বিন্নি কিছু জমিতে চাষ করি। এছাড়া আর কোনো দেশীয় জাতের ধান চাষ করি না। আমরাও চাই দেশি প্রজাতির ধান চাষ করতে। তবে ফলন কম ও খরচ বিবেচনা করে তা আর করা হয় না। দেশীয় জাতের বীজ যদি রুপান্তর করে উচ্চ ফলনশীল করা যেতো তাহলে হয়তো আবার আমরা দেশীয় জাতের ধান চাষ করতে আগ্রহী হতাম।
‘আমাদের দেশে দেশীয় ধানের নম্বর রেজিস্ট্রার এবং বীজ সংরক্ষণের অভাবে তা বিলুপ্ত হচ্ছে। উন্নত দেশে জার্মপ্লাজম সেন্টারে গবেষণা করে বীজ সংরক্ষণ করে। আমাদের দেশি ধান গবেষণা করে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। দেশি জাতের কয়েক হাজার প্রজাতির ধান ছিল, এখন আর নেই।’
কৃষিবিদ শাকের আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে স্থানীয় জাতের ধান নিয়ে ব্যাপকভাবে গবেষণা করা প্রয়োজন। দেশীয় জাতের ধান গবেষণার মাধ্যমে যদি একটু ফলন বাড়ানো যায় তাহলে কৃষকেরা আগ্রহ নিয়ে তা চাষ করবেন। গ্রামের বড় ও মাঝারি কৃষকেরা শতশত বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন। তাদের হাতে দেশীয় জাতের ধানের বীজ দিলে আগ্রহ নিয়ে কিছু জমিতে হলেও ধান চাষ করবেন। উচ্চ ফলনশীল বা হাইব্রিড জাতের ধান চাষের কারণে জমির উর্বরতাও কমে যায়। দেশীয় জাতের ধানগুলো যেনো একেবারে হাঁড়িয়ে না যায় এজন্য সরকারের উচিত ব্যাপকভাবে গবেষণা করা।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন বলেন, এ জেলায় সবচেয়ে বেশি উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ করা হয়। কৃষকেরা আগ্রহ নিয়ে তা চাষ করেন। কৃষকেরা মনে করেন টাকা খরচ করে চাষ করছি ফলন বেশি পেতে হবে। এজন্য দেশি জাতের ধান চাষে আগ্রহ হারিয়েছেন।
তিনি বলেন, যত সময় যাচ্ছে ততই আমাদের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাদ্যের অভাব দূর করার জন্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। একটা সময় জনসংখ্যা কম ছিল মানুষ দেশি জাতের ধান চাষ করেছেন। এখন উৎপাদন বাড়ানো খুবই প্রয়োজন।
এনএইচআর




