র্যাবের হাতে গ্রেফতাররা জড়িত নন, নতুন দুজন গ্রেফতার: ডিবি
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ছিনতাইয়ের সময় শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনকে হত্যার ঘটনায় নতুন করে দুজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন, খোকন ও রাজীব মাতব্বর। তাদের কাছ থেকে ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, ভুক্তভোগীর ব্যাগ ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবি দাবি করেছে, এ ঘটনায় র্যাব আগে যে দুজনকে গ্রেফতার করেছিল এবং যে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছিল, তা সঠিক নয়।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, গত ২৯ আগস্ট শেরেবাংলা নগর থানাধীন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পূর্ব প্রান্তে জাতীয় সংসদ ভবনের ১২ নম্বর গেটের পর খেজুরবাগানের মুখে সড়কে ছিনতাইয়ের শিকার হন শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন। ছিনতাইয়ের সময় রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহতের স্বামী মোহাম্মদ আবদুল মতিন বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার জানান, ঘটনার পর তেজগাঁও বিভাগ ও গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থলে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তের পর ঢাকা, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়।
অভিযানের প্রথম পর্যায়ে খোকনকে মিরপুরের মনিপুর পশ্চিমপাড়া থেকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে খোকন জানায়, ঘটনার সময় সে মোটরসাইকেলের পেছনে বসেছিল এবং রনজিনা পারভীনের ব্যাগ হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিয়ে নেয়।
গ্রেফতার খোকনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর থানার বড়বাগ এলাকা থেকে ভুক্তভোগীর ছিনতাই হওয়া ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ব্যাগে তার ব্যবহৃত পোশাক, টিকিটের অংশ, চশমার খাপ ও কিছু ওষুধ ছিল। পরে মিরপুর-১ এলাকা থেকে ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তী অভিযানে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজীব মাতব্বরকে বিরুলিয়া এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
ডিবি প্রধান জানান, ঘটনার সময় রাজীব মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন। তার দেওয়া তথ্য ও দেখানো জায়গা অনুযায়ী দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। তার হেফাজত থেকে ৬২২টি ইয়াবাও উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার রাজীবের বিরুদ্ধে অস্ত্র, দস্যুতা, চুরি, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনের মামলাসহ মোট আটটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে খোকনের বিরুদ্ধে মাদকের তিনটি মামলা রয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, তারা শুধু এই একটি ঘটনায় জড়িত, নাকি নিয়মিত ছিনতাইয়ের সঙ্গে যুক্ত তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ঢাকা মহানগরীর অন্য কোনো ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
আগের গ্রেফতার ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট নন
রনজিনা পারভীন হত্যার ঘটনায় এর আগে র্যাব দুজনকে গ্রেফতার করেছিল। তাদের সঙ্গে নতুন করে গ্রেফতার হওয়া দুজনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, তাদের অবস্থান ও গ্রুপ আলাদা। নতুন করে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা পশ্চিম মনিপুর এলাকায় থাকেন, আর র্যাবের গ্রেফতার করা ব্যক্তিরা তেজতুরীপাড়া এলাকার। তারা দুটি ভিন্ন গ্রুপ।
তিনি বলেন, র্যাবের গ্রেফতার করা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের একজনের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা ছিল। জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হওয়া গেছে, তারা এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন।
ডিবির এ কর্মকর্তা বলেন, কোনো ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা তদন্তের একটি অংশ। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেলে তাদের মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই মামলাতেও আগে গ্রেফতার ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা না থাকলে তাদের বাদ দেওয়া হবে। তবে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা থাকলে সেসব মামলায় তারা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকবেন।
উদ্ধার মোটরসাইকেল নিয়ে ব্যাখ্যা
ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল নিয়ে র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের সঙ্গে পার্থক্যের বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, র্যাব যে মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছিল সেটির রং এবং সিসিটিভি ফুটেজে দেখা মোটরসাইকেলের রং ভিন্ন।
নতুন করে গ্রেফতার হওয়া দুজন স্বীকার করেছেন, ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা মোটরসাইকেলই। মোটরসাইকেলটি রাজীবের নিজের, এটি ভাড়া করা হয়নি।
এ ছাড়া খোকনের পরনের শার্ট, হাতে থাকা ঘড়ি ও মাথায় থাকা ক্যাপও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিবির এই কর্মকর্তা।
শফিকুল ইসলাম বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামতের মধ্যে রয়েছে ভুক্তভোগীর ব্যাগ, মোবাইল ফোন, পোশাক, ওষুধ ও টিকিট। এসব আলামত উদ্ধার করা হয়েছে এবং সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় রনজিনার স্বামী এক ঝলক ছিনতাইকারীকে দেখেছিলেন। পরে তার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বিষয়টি তার মনে পড়ে। তিনি পেছনে থাকা ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছেন।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্তে তথ্য-উপাত্ত ও আলামতের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ এবং উদ্ধার করা আলামত বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে গ্রেফতার দুজনের সঙ্গে ঢাকার অন্য কোনো ছিনতাই বা অপরাধের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
টিটি/এমএএইচ/



