ইরানের হাতে আরও এক ‘ট্রাম্প কার্ড’, দিশেহারা সৌদি আরব
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবার নতুন করে ইয়েমেনকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রগতি এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় হামলার ঘটনায় আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে হুথিদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় সৌদি আরবের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বেশ কিছু এলাকা দখলের দাবি করেছে হুথিরা। গত সপ্তাহে কৌশলগত বন্দরনগরী মোচা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির পেরিম দ্বীপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে তারা। এ প্রণালি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মাধ্যমে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের দক্ষিণ প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত।
হুথিদের এই অগ্রগতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে সৌদি আরব। কারণ, হুথিরা আগেই সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির মতো বাব-আল মান্দেব হয়ে উঠছে ইরানের আরেক ‘ট্রাম্প কার্ড’।
মক্কা-জেদ্দায় সতর্কতা
সৌদি আরবের অভিযোগ, পবিত্র মক্কা নগরীর দক্ষিণে হুথিদের একটি ড্রোন হামলার চেষ্টা প্রতিহত করেছে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ড্রোনটি শনাক্ত করা হয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, মক্কার নির্ধারিত আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেছে, মক্কা ও মুসল্লিদের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র নগরীর দিকে কোনো ধরনের হামলা মেনে নেওয়া হবে না। তবে হুথিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, সৌদি আরব প্রচারের উদ্দেশ্যে এমন অভিযোগ তুলছে।
মঙ্গলবার সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে নিরাপত্তা সতর্কতাও জারি করা হয়। এর মধ্যে মক্কা ও দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর জেদ্দাও ছিল।
সৌদি আরবে থাকা মার্কিন দূতাবাসও নাগরিকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে। দূতাবাসের সতর্কতায় বলা হয়েছে, হুথিদের হামলায় শহর, অবকাঠামো, বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি, কূটনৈতিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
সৌদির তেল সরবরাহে নতুন চাপ
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর সৌদি আরব উপসাগরীয় এলাকা থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাতে তাদের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক হামলায় পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি বন্ধ করতে হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি আরব।
এই হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের দায়ী করেছে রিয়াদ। কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতে, পাইপলাইনটি পুরোপুরি মেরামত করতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে। তবে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই পাইপলাইন দিয়ে আবার তেল সরবরাহ শুরু হতে পারে।
পাইপলাইনটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ইয়েমেনে সংঘাতের বিস্তার শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাইছে রিয়াদ
হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি যুবরাজ ও দেশটির কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
তবে এখন পর্যন্ত সরাসরি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে এই সংঘাতে যুক্ত করার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সম্মতি দেয়নি। বরং গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য শনাক্তকরণে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
হুথিদের মোকাবিলায় ইসরায়েলের কাছেও সহযোগিতা চেয়েছে সৌদি আরব, এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সৌদি আরব বা ইসরায়েল সরকারিভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি
এর মধ্যেই ইয়েমেনের মারিব গভর্নরেটের আকাশসীমায় সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে হুথিরা।
বুধবার হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে ‘শত্রুতামূলক অভিযান’ চালানোর সময় সৌদি যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়। স্থানীয়ভাবে তৈরি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বিমানটি ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে এই দাবির পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
এর আগে হুথিরা দাবি করেছিল, তারা সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর কাছ থেকে বেশ কিছু সাঁজোয়া যান দখল করেছে। প্রকাশিত ভিডিওতে যুদ্ধবিমান ও বিস্ফোরণের দৃশ্যও দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের জন্য নতুন কৌশলগত সুবিধা?
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব এরই মধ্যে স্পষ্ট। ইরান ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দাবি করছে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ তৈরি হয়েছে।

এখন ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রযাত্রার কারণে বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে একই সময়ে অস্থিরতা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌপথের ওপর চাপ বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
একদিকে হুথিদের ঠেকাতে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সহযোগিতা চাইছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধ এখন শুধু সৌদি-হুথি সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে হরমুজ, বাব আল-মান্দেব, তেল সরবরাহ এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের হিসাব।
সব মিলিয়ে ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি সৌদি আরবের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দুই নৌপথ ঘিরে অস্থিরতা বাড়তে থাকলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি
এমএসএম




