মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জ্বালানি সংকটে বিশ্ব, দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে বিক্ষোভ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বেড়েছে জ্বালানির দাম। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদে বিভিন্ন দেশে রাস্তায় নেমেছে মানুষ।
বিশেষ করে, অপেক্ষাকৃত কম আয়ের দেশগুলোতে পরিস্থিতি বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে। জ্বালানির বাড়তি খরচে চাপে পড়েছে পরিবার, পরিবহন খাত ও ব্যবসা।
১০০ ডলারের ওপর তেলের দাম
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারে নতুন করে হামলার পর গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় বাব আল–মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রেও। বেড়েছে পেট্রলের দাম। শীতকালে হিটিং অয়েলের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর ব্যয় নিয়েও সতর্কতা জারি হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন। তবে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোতে এর প্রভাব আরও তীব্র। জ্বালানির বাড়তি দাম দেশগুলোর অর্থনীতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আয়–ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি করছে।
সিরিয়া
সিরিয়ায় সপ্তাহান্তে জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। আসাদ সরকারের পতনের দুই বছর পর দেশটিতে এটিই সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ।
সিরিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা সানার তথ্য অনুযায়ী, সরকার সাময়িকভাবে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৭৫ সিরীয় পাউন্ডে উন্নীত করেছে। এতে দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। গ্যাসের দামও ২৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে।
দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলেছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া এবং বেনিয়াস তেল শোধনাগারে চলমান রক্ষণাবেক্ষণের কারণে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। এ কারণে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হলেও বেশিরভাগ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে গত রোববার হাসাকা–দেইর এজ–জোর মহাসড়ক অবরোধ করেন বিক্ষোভকারীরা। তারা টায়ারে আগুন দেন এবং তেলবাহী ট্যাংকার আটকে দেন।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির বিশ্লেষক মুয়াজ আল আবদুল্লাহ বলেন, জ্বালানির সংকট, দাম বৃদ্ধি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং সেবার দুর্বলতা দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
তার মতে, অর্থনৈতিক ক্ষোভ এখন সরকারের সিদ্ধান্ত ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ক্ষোভে রূপ নিচ্ছে।
গুয়াতেমালা
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত সপ্তাহে গুয়াতেমালায় ট্রাকচালকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ মহাসড়ক অবরোধ করেন। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভের পাশাপাশি কিছু স্থানে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও ঘটে।
গুয়াতেমালা সিটিতে আবার অনেকে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করেন। তারা জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত সরকারি পদক্ষেপের দাবি জানান।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির কংগ্রেস একটি আইনের প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে। প্রস্তাবটি পাস হলে বছরের শেষ পর্যন্ত জ্বালানির দাম নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার ব্যবস্থা হবে। দাম নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেলে জ্বালানি আমদানিকারকদের ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট লুইস কনত্রেরাস কোলিনদ্রেস বলেন, জ্বালানির বর্তমান দাম সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।
পর্তুগাল
পর্তুগালের উপকূলীয় শহর এসপিনহোতে গত শনিবার জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের আয়োজনে প্রায় ৮০ জন এতে অংশ নেন। বিক্ষোভকারীরা মিছিল করে প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্তেনেগ্রোর এসপিনহোর বাসভবনের সামনে যান।
দেশটির স্বেচ্ছাসেবী ফায়ার সার্ভিসও জ্বালানির বাড়তি দাম নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। পর্তুগিজ ফায়ারফাইটার্স লিগ বলেছে, জ্বালানির বর্তমান ব্যয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর জন্য অসহনীয় হয়ে উঠছে।
এরপর সোমবার জ্বালানির মূল্যসংকট কমাতে নতুন কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে সরকার। পণ্য পরিবহনকারী, ট্যাক্সিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সামাজিক খাতকে সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।
ফ্রান্স
ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর ফস-সুর-মেরে গত মঙ্গলবার প্রায় ৫০ জন জেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ডিপো অবরোধ করেন। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদও ছিল তাদের কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।
কয়েক ঘণ্টা অবরোধ চলার পর বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। শহরটির মেয়র ফিলিপ মরিজো বলেন, স্থানীয় মৎস্য খাত গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে এবং সরকারের জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাড়তি ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া এবং অনিশ্চয়তার কারণে অনেক পেশাজীবী কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন।
ফিলিপাইন
ফিলিপাইনে জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে গত সোমবার ধর্মঘটে যান পরিবহন শ্রমিকদের সংগঠন মানিবেলার সদস্যরা। তারা সরকারি ভর্তুকি এবং জ্বালানির ওপর কর প্রত্যাহারের দাবি জানান।
দেশটির জ্বালানি কোম্পানিগুলো সম্প্রতি আবারও জ্বালানির দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ফিলিপাইন নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার থেকে পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি ৫ দশমিক ৬৮ পেসো বেড়েছে। ডিজেল ও কেরোসিনের দামও বাড়ানো হয়েছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পরিবার, পরিবহন শ্রমিক ও ব্যবসার ওপর পড়ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী শ্যারন এস গ্যারিন। সরকার পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর আবগারি কর কমানোর সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করছে।
যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে জীবনযাত্রায়
ফিলিপাইনে কয়েক মাস ধরে বাসচালক ও অন্যান্য পরিবহন শ্রমিকেরা বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের চাপে রয়েছেন। গত মার্চে পরিস্থিতি সবচেয়ে তীব্র হওয়ার সময় ম্যানিলায় বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্টের প্রাসাদের দিকে মিছিল করেন। তারা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ জানান।
শ্রমিকনেতা জেরোম অ্যাডোনিস তখন বলেন, তেলের সরবরাহে বিঘ্নের প্রভাব সবার ওপর পড়ছে।
শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোও চলতি বছরে বিভিন্ন বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জীবনযাত্রার সামগ্রিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদও জানিয়েছেন তারা।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সূত্র: সিএনএন
কেএএ/









