স্বামীকে হারানো অন্তঃসত্ত্বা দুই স্ত্রীর ভবিষ্যৎ কী, ৪ সন্তানের কী হবে
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুনের আতংকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পড়ে গিয়ে পদদলিত হয়ে নিহত হন সিএনজি চালক রমজান আলী (৩৮)। স্বামীকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তার দুই স্ত্রী। তারা দুজনই অন্তঃসত্ত্বা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীর মৃত্যুতে অনাগত সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
নিহত রমজান আলী জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের মৃত আহাম্মদ আলীর ছেলে।
তার ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার দিন সকালে বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন রমজান আলী। পরীক্ষায় তার হার্টের সমস্যা ধরা পড়ে। তিনি হাসপাতালের চারতলায় ভর্তি ছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, রমজান আলী দুটি বিয়ে করেছেন। তার দুই স্ত্রীর নামই খাদিজা। একজনের বয়স ৩৫, অপরজনের বয়স ২৭ বছর। দুই স্ত্রীর ঘরের দুটি করে চার ছেলেমেয়ে রয়েছে। বর্তমানে শাহজাহানের দুই স্ত্রীই অন্তঃসত্ত্বা। একজন সাত মাসের ও অন্যজন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাই রমজান আলী ফুলবাড়িয়া শাখা এশিয়া ব্যাংক থেকে এক লাখ ৫ হাজার, এনজিও থেকে ৬০ হাজার ও বিভিন্নজনের কাছ থেকে অন্তত এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। এখন তার দুই স্ত্রী সংসার চালাবে নাকি ঋণ দেবে? সরকার যদি সহায়তা না করে, তারা দুজনই চরম বিপাকে পড়বে।’
হাসপাতালে কথা হয় রমজানের স্ত্রী খাদিজার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা চারতলায় ভর্তি ছিলাম। আগুন লাগার খবরে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আমার স্বামী সিঁড়িতে পড়ে যান। পদদলিত হয়ে তিনি মারা যান।’
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘স্বামীকে বাঁচাতে হাসপাতালে নিয়ে এলাম, সেই হাসপাতালের আগুনেই মারা গেলেন আমার স্বামী। আমার স্বামীর দুটি সংসার। দুই সংসারই এখন অথৈ সাগরে ভাসছে। কীভাবে চলবে সংসার?’
তিনি আরও বলেন, তাদের কোনো অর্থ-সম্পদ নেই। স্বামীই ছিলেন সংসারের একমাত্র ভরসা। স্বামীকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার আশায় তিনি তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বামীর মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাকে।
‘আমার চারটি সন্তান। আবার আমি গর্ভবতী। আমার স্বামী সিএনজি চালিয়ে সংসার চালাতেন। এখন আমি কী খাবো, সন্তানদের কীভাবে বড় করবো, কিছুই বুঝতে পারছি না’, বলছিলেন খাদিজা।
স্বামীর মৃত্যুর পর এক সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন দ্বিতীয় স্ত্রী। তার নিজের কোনো ঘরবাড়ি নেই। স্বামী যে ছোট্ট একটি ঘর করে দিচ্ছিলেন, সেটিও এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
খাতিজা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার স্বামী ফোন দিয়ে বলেছিলেন, আমি আসতেছি, সুস্থ হয়ে গেছি। কিন্তু তিনি আর বাড়িতে আসতে পারলেন না। আমি আমার স্বামীকে চাই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কারণে যদি এমন হয়ে থাকে (মারা যায়), তাহলে আমি তাদের শাস্তি চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আগে গার্মেন্টসে চাকরি করে সংসার চালাতাম। এখন আমি অন্তঃসত্ত্বা, তাই চাকরি করতে পারি না। আমার এই মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাবো? কে আমাদের খাওয়াবে? আমার বাড়িঘর কিছুই নেই।’
স্বামীর সংসারে সিএনজিটিই ছিল বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন জানিয়ে খাতিজা বলেন, ‘আমার স্বামী সিএনজি চালিয়ে সংসার চালাতেন। অনেক কষ্ট করে সিএনজিটি কিনেছিলাম। এখনো সেই ঋণ শোধ করতে পারিনি। স্বামী চলে যাওয়ার পর আমি কীভাবে সেই ঋণ শোধ করবো?’
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালের বিভিন্ন তলা থেকে রোগী ও স্বজনরা আতংকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকেন। এসময় কয়েকজন আহত হন। এর মধ্যেই জরুরি বিভাগের রেজিস্টারে চারজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনার তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, ‘একজন নার্স তাৎক্ষণিকভাবে রেজিস্টারে তথ্য লিখেছিলেন। তবে ওই চারজন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন, এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তাদের শরীরেও পদদলিত হওয়ার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘লিফটে আগুন লাগার ঘটনায় কোনো গাফিলতি ছিল কি-না, তদন্ত কমিটি তা খতিয়ে দেখবে। ঘটনায় কারও গাফিলতি থাকলে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে।’
এরআগে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
এসআর



