চট্টগ্রামে হামে আক্রান্ত শিশুদের ৮৫.২ শতাংশই টিকা নেয়নি
চট্টগ্রাম বিভাগে হামে আক্রান্ত ৩০০ শিশুর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের ৮৫.২ শতাংশই টিকাবিহীন। তবে টিকাবিহীন শিশুদের একটি বড় অংশ তখনো নিয়মিত টিকাদানের বয়সে পৌঁছায়নি বলে এতে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণার প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ‘বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাব: রোগতাত্ত্বিক চিত্র, ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্য, জিনগত বিশ্লেষণ এবং মা ও শিশুর অ্যান্টিবডির অবস্থা’ শীর্ষক এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের ৪৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। সাধারণত ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম টিকা দেওয়া হয়। অর্থাৎ আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমিত হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের বয়স ২ মাস থেকে ১১ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের ৭৫.৫ শতাংশ গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত এলাকার এবং ৬৪.৮ শতাংশ নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবারের। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩১ শতাংশ তীব্র বা একিউট পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল।
টিকা না নেওয়ার কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, টিকাবিহীন শিশুদের মধ্যে ৫২ শতাংশের ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব বা টিকার তারিখ ভুলে যাওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ৩০ শতাংশ শিশু অসুস্থ থাকার কারণে, ৮ শতাংশ মায়ের অসুস্থতার কারণে, ৪ শতাংশ টিকার ভয় এবং ৪ শতাংশ টিকা কার্ড হারিয়ে ফেলায় টিকা নেয়নি।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, মাত্র ৩২.১ শতাংশ শিশু গত ছয় মাসে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেয়েছিল। ভিটামিন ‘এ’ না পাওয়া শিশুদের মধ্যে ৫৯ শতাংশের মারাত্মক বা তীব্র জটিলতা দেখা গেছে।

হামের উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু
হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে জ্বর, ফুসকুড়ি, কাশি, সর্দি ও চোখ ওঠার মতো উপসর্গ ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। রোগীদের জ্বরের গড় স্থায়িত্ব ছিল ৭ দশমিক ৩০ দিন এবং ফুসকুড়ির গড় স্থায়িত্ব ৫ দশমিক ৬৪ দিন।
গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের ৫৯.৪ শতাংশ কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে হামে আক্রান্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
প্রাথমিক বিশ্লেষণে মাঝারি বা তীব্র পুষ্টিহীনতা, গ্রামীণ বা বস্তি এলাকায় বসবাস, দরিদ্রতা, অতিরিক্ত জনবহুল ঘর এবং ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতিকে মারাত্মক জটিলতার ঝুঁকি বাড়ানোর কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে মাঝারি বা তীব্র পুষ্টিহীনতাকে মারাত্মক জটিলতার সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্বাধীন কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ পরিবেশ ও অপর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করে এমন ঘরেও ঝুঁকি বেড়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের তুলনায় টিকাবিহীন শিশুদের মারাত্মক জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় দ্বিগুণ ছিল। টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
গবেষণায় মা ও শিশুর অ্যান্টিবডির অবস্থাও বিশ্লেষণ করা হয়। ৯১ জন মায়ের (৯৪.৮ শতাংশ) Measles IgG positive পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে ৩৬ জন (৩৭.৫ শতাংশ) আগে হাম টিকা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে maternal IgG status-এর সঙ্গে severe disease বা pneumonia-এর পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
অনুষ্ঠানে হাম থেকে শিশুদের সুরক্ষায় সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের আইসোলেশন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, প্রায় অর্ধেক শিশু নিয়মিত টিকাদানের বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছে। তাই শুধু টিকাদান নয়, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুদের অন্য রোগীদের থেকে আলাদা রেখে চিকিৎসা করতে হবে।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং আগের কয়েক বছরের ব্যর্থতার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ভ্যাকসিনেশন ও আইসোলেশন দুটোই নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও এত রোগী কেন এ বিষয়টি দেখতে হবে। যেহেতু হাম উচ্চ সংক্রমণশীল, তাই এখন মূল কাজ আইসোলেশন নিশ্চিত করা। শিশুর মায়েদের পুষ্টিও নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রামের সিআরবিতে অবস্থিত রেলওয়ে হাসপাতালকে হামে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতাল করার বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলেও জানান মেয়র।
তিনি বলেন, রেলওয়ে হাসপাতালকে যদি ডেডিকেটেড হামের হাসপাতাল করা যায়, তাহলে সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। স্বাস্থ্য বিভাগ উদ্যোগ নিলে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করব।
অনুষ্ঠানে এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড ও এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান গোলাম বাকী মাসুদ বলেন, এ গবেষণা শুধু একটি প্রাদুর্ভাবের পরিসংখ্যান তুলে ধরার উদ্যোগ নয়; বরং হাম প্রতিরোধ, শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির জন্য প্রমাণভিত্তিক করণীয় তৈরির একটি প্রয়াস।
তিনি বলেন, গবেষণার ফলাফলকে বাস্তবভিত্তিক জনস্বাস্থ্য উদ্যোগে রূপান্তর করতে হবে। গবেষণা শুধু ফলাফল পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবং পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. তসলিম উদ্দিন।
এছাড়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক-গবেষকসহ স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এমআরএএইচ/ইএ



